নিজস্ব প্রতিবেদক | শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬ | 14 বার পঠিত | প্রিন্ট
নিজস্ব প্রতিবেদক: বিমা খাতে গ্রাহকের আস্থা ফিরিয়ে আনা, বিমাকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে গড়ে তোলা এবং খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি—এই তিন স্তম্ভকে সামনে রেখে সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনার ঘোষণা দিয়েছেন বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন। তিনি বলেছেন, বর্তমানে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার অনিষ্পন্ন বিমা দাবি নিষ্পত্তিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। সব ধরনের বিকল্পব্যবস্থা বিবেচনার পরও প্রয়োজন হলে সরকারের কাছে এককালীন (ওয়ান-টাইম) বেইলআউট প্যাকেজের প্রস্তাবও দেওয়া হতে পারে।
শনিবার (২৭ জুন) ইন্স্যুরেন্স রিপোর্টার্স ফোরাম (আইআরএফ) আয়োজিত ‘বিমা খাতের চ্যালেঞ্জ, সম্ভাবনা ও করণীয়’ শীর্ষক এক সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
তিন স্তম্ভভিত্তিক সংস্কার কাঠামো
আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর এক সপ্তাহ ধরে খাতের বিভিন্ন সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে ধারণা নিয়েছেন। তবে তিনি কেবল সমস্যা নয়, সমাধানভিত্তিক সংস্কারে বিশ্বাসী। সে লক্ষ্যেই একটি সংস্কার কাঠামো (রিফর্ম ফ্রেমওয়ার্ক) তৈরি করা হয়েছে।
তিনি বলেন, বিমা খাতের সংস্কারের প্রথম স্তম্ভ হলো পলিসিধারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার। দ্বিতীয় স্তম্ভ বিমাকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণি (লং-টার্ম ইনভেস্টমেন্ট ক্লাস) হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এবং তৃতীয় স্তম্ভ খাতের সক্ষমতা (ক্যাপাসিটি) বৃদ্ধি, যাতে দীর্ঘমেয়াদে একটি টেকসই বিমা শিল্প গড়ে ওঠে।
৭ হাজার কোটি টাকার দাবি নিষ্পত্তিতে অগ্রাধিকার
মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, আইডিআরএর তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে বিমা খাতে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার অনিষ্পন্ন দাবি রয়েছে। এর মধ্যে জীবন ও সাধারণ উভয় ধরনের বিমা কোম্পানির দাবি রয়েছে।
আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, প্রতিটি কোম্পানির সঙ্গে আলাদাভাবে বসে তাদের আর্থিক ও পরিচালনাগত সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের চেষ্টা করা হবে। কোথাও সম্পদ বিক্রি, কোথাও আটকে থাকা অর্থ উদ্ধার কিংবা অন্য কোনো উপায়ে দাবি পরিশোধের সুযোগ তৈরি করা গেলে আইডিআরএ তা সমন্বয় করবে।
তিনি বলেন, অনেক কোম্পানির এফডিআরের অর্থ দুর্বল হয়ে পড়া ব্যাংকে আটকে আছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। পাশাপাশি ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ করা অর্থ প্রয়োজন অনুযায়ী নগদায়নের সুযোগও বিবেচনা করা হবে।
বিবেচনায় এককালীন বেইলআউট
এসব উদ্যোগের পরও যদি বড় অঙ্কের দায় থেকে যায়, তাহলে এককালীন বেইলআউট প্যাকেজের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে বলে জানান আইডিআরএ চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, সরকারের কাছে যাওয়ার আগে বিমা কোম্পানি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে নিজেদের ‘হোমওয়ার্ক’ শেষ করতে হবে। সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যে ভবিষ্যতে একই ধরনের সংকট আর সৃষ্টি হবে না। এজন্য কোম্পানিগুলোকে সুশাসন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় কী পরিবর্তন আনা হচ্ছে এবং আইডিআরএ নিয়ন্ত্রক হিসেবে কী ধরনের সংস্কার করছে, তা স্পষ্টভাবে দেখাতে হবে।
অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ খাত
আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় এখন ৩ হাজার ডলারের বেশি এবং দেশ অর্ধ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। ভবিষ্যতে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য অর্জন করতে হলে একটি শক্তিশালী বিমা খাত অপরিহার্য।
তিনি বলেন, একই পর্যায়ের অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের বিমা খাত অনেক পিছিয়ে রয়েছে। অথচ উন্নত অর্থনীতিগুলোতে বিমা খাত শুধু ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মাধ্যম নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের অন্যতম বড় উৎস।
পুঁজিবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়াতে চায় আইডিআরএ
চেয়ারম্যান বলেন, দেশের পুঁজিবাজারে বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর অভাব রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিমা কোম্পানিগুলো শেয়ারবাজারের অন্যতম বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী হিসেবে কাজ করে। বিশেষ করে নতুন কোম্পানির প্রাথমিক শেয়ার (আইপিও) ইস্যুতে বিমা কোম্পানির বড় ভূমিকা থাকে।
তিনি বলেন, একটি শক্তিশালী বিমা খাত গড়ে উঠলে পুঁজিবাজারের গভীরতা বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের উৎস তৈরি হবে। তাই পুঁজিবাজার সংস্কার ও বিমা খাতের উন্নয়ন পরস্পরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
দুর্যোগ মোকাবিলায় বিমার ভূমিকা বাড়ানোর পরিকল্পনা
বাংলাদেশকে দুর্যোগপ্রবণ দেশ উল্লেখ করে চেয়ারম্যান বলেন, প্রতি বছর ঘূর্ণিঝড়, বন্যাসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে জাতীয় অর্থনীতির উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়। এসব দুর্যোগের পর পুনর্বাসনে সরকারকে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়।
তিনি বলেন, উন্নত দেশগুলোতে বিমার মাধ্যমে ঝুঁকি বণ্টন করে সরকারের আর্থিক চাপ কমানো হয়। বাংলাদেশেও বিমা খাতকে সেই ভূমিকা পালনের উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। এতে আর্থিক স্থিতিশীলতা বাড়বে এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধাক্কাও তুলনামূলক সহজে মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।
মাইক্রোইনস্যুরেন্স ও তাকাফুলে নতুন উদ্যোগ
আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, দেশে মাইক্রোফাইন্যান্সের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক থাকলেও সেটিকে ব্যবহার করে কার্যকর মাইক্রোইনস্যুরেন্স গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। এজন্য প্রয়োজনীয় আইন ও বিধিমালা প্রণয়ন করে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মাইক্রোইনস্যুরেন্স সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এ ছাড়া ইসলামি বিমা বা তাকাফুল খাতের জন্যও প্রয়োজনীয় নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো তৈরি করা হবে বলে জানান তিনি।
দক্ষ জনবল গড়তে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিমা শিক্ষা
খাতের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়ে চেয়ারম্যান বলেন, সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিমা বিষয়ে বিভাগ, মেজর, মাইনর কিংবা সার্টিফিকেশন কোর্স চালুর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। এতে খাতে দক্ষ জনবল তৈরি হবে এবং তরুণদের কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।
তিন পক্ষের সদিচ্ছা ছাড়া সংস্কার সম্ভব নয়
চেয়ারম্যান বলেন, কোনো খাতের সংস্কারের জন্য তিনটি পক্ষের সদিচ্ছা অপরিহার্য—সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, শিল্পমালিকদের আন্তরিকতা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকর ভূমিকা। এই তিন পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া কোনো সংস্কারই সফল হয় না।
তিনি বলেন, আইডিআরএ প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত। যেখানে যেতে হবে, যাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে, যেভাবে উদ্যোগ নিতে হবে—সবই করা হবে। তবে এজন্য বিমা কোম্পানিগুলোকেও আন্তরিক হতে হবে।
তিনি আরও বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, বিমা কোম্পানি ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে প্রতিপক্ষ হিসেবে নয়, অংশীদার হিসেবে কাজ করতে হবে। একসঙ্গে কাজ করলেই দেশের বিমা খাতকে একটি শক্তিশালী ও টেকসই অবস্থানে নিয়ে যাওয়া সম্ভব।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিমা কোম্পানির মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএ) সভাপতি সাঈদ আহমেদ এবং বিমা কোম্পানির মুখ্য নির্বাহীদের সংগঠন বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরামের (বিআইএফ) সভাপতি বিএম ইউসুফ আলী প্রমুখ।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘদিনের জটিলতায় জর্জরিত বিমা খাতে আইডিআরএ চেয়ারম্যানের এই উদ্যোগ সময়োপযোগী। তবে ৭ হাজার কোটি টাকার দাবি নিষ্পত্তি ও খাতের সংস্কার বাস্তবায়নে কোম্পানিগুলোর আন্তরিকতা ও সরকারের কার্যকর সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুঁজিবাজার ও বিমা খাতের সমন্বিত উন্নয়ন দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
Posted ৬:২০ পিএম | শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬
sharebazar24 | sajed khan
.
.