নিজস্ব প্রতিবেদক | শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬ | 28 বার পঠিত | প্রিন্ট
নিজস্ব প্রতিবেদক: শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের জমা রাখা নগদ অর্থ ও শেয়ারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ব্রোকারেজ হাউসের অনিয়ম, হিসাবের গরমিল এবং মূলধন ঘাটতি দ্রুত শনাক্ত করতে সমন্বিত প্রযুক্তি ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এ লক্ষ্যে দেশের সব ব্রোকারেজ হাউসকে একটি অভিন্ন ও সমন্বিত ব্যাক-অফিস সফটওয়্যারের আওতায় আনার সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।
প্রস্তাবিত এই ব্যবস্থা কার্যকর হলে ব্রোকারেজ হাউসগুলোর ব্যাংক হিসাব, গ্রাহকদের সমন্বিত গ্রাহক হিসাব (কনসোলিডেটেড কাস্টমার অ্যাকাউন্ট বা সিসিএ) এবং শেয়ার-সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা যাবে। বিএসইসির প্রত্যাশা, এর ফলে নগদ অর্থ ও শেয়ারের হিসাবে কোনো অসংগতি কিংবা অনিয়ম দেখা দিলে দ্রুত তা শনাক্ত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের সম্পদের সুরক্ষা আরও জোরদার হবে।
সম্প্রতি বিএসইসির কার্যালয়ে এ বিষয়ে একটি পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে বিএসইসি, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই), চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই), সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল) এবং সেন্ট্রাল কাউন্টারপার্টি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিসিবিএল) প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সভায় অভিন্ন ব্যাক-অফিস সফটওয়্যার চালুর সম্ভাব্য প্রযুক্তিগত সুবিধা, বাস্তবায়ন ব্যয়, কার্যক্রম পরিচালনার চ্যালেঞ্জ এবং সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকিসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
এর আগে গত ২৮ সেপ্টেম্বর বিএসইসির চেয়ারম্যান মাসুদ খান ব্রোকারেজ হাউসগুলোতে জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাৎ প্রতিরোধে সমন্বিত ব্যাক-অফিস প্রযুক্তি ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, নিয়মিত বিরতিতে ব্রোকারেজ হাউসের ব্যাংক স্থিতির সঙ্গে গ্রাহকদের সমন্বিত হিসাবের আর্থিক তথ্য যাচাই করা হলে অর্থ তছরুপের ঘটনা প্রাথমিক পর্যায়েই শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
কেন প্রয়োজন অভিন্ন ব্যাক-অফিস সফটওয়্যার
বর্তমানে দেশের ব্রোকারেজ হাউসগুলো বিভিন্ন তৃতীয় পক্ষের প্রতিষ্ঠানের তৈরি পৃথক পৃথক ব্যাক-অফিস সফটওয়্যার ব্যবহার করছে। ফলে সব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক হিসাব ও শেয়ার-সংক্রান্ত তথ্য একই কাঠামোর আওতায় এনে তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা বিএসইসি ও স্টক এক্সচেঞ্জগুলোর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ব্রোকারেজ হাউসের নথিতে থাকা তথ্যের সঙ্গে প্রকৃত ব্যাংক হিসাব কিংবা শেয়ার পোর্টফোলিওর অসংগতি শনাক্ত করতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়।
সমন্বিত সফটওয়্যার চালু হলে ব্যাংকের তথ্যের সঙ্গে গ্রাহক হিসাবের নগদ অর্থের পরিমাণ মিলিয়ে দেখা যাবে। একইভাবে সিডিবিএলের সংরক্ষিত নথির সঙ্গে যাচাই করা সম্ভব হবে ব্রোকারেজ হাউসের শেয়ারের প্রকৃত পরিমাণ। কোনো প্রতিষ্ঠানের হিসাবে ঘাটতি বা অসংগতি দেখা দিলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে সতর্কবার্তা পৌঁছে যাবে। এর ফলে দ্রুত আইনি কিংবা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
বাস্তবায়নে ব্যয় বাড়বে, থাকবে প্রযুক্তিগত ঝুঁকিও
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন ব্যবস্থা চালু করতে ব্রোকারেজ হাউসগুলোকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হতে পারে। বিদ্যমান সফটওয়্যার থেকে নতুন ব্যবস্থায় তথ্য স্থানান্তর, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণের জন্য এই ব্যয় প্রয়োজন হবে।
এ ছাড়া পুরো শেয়ারবাজারের ব্রোকারেজ কার্যক্রম একটি কেন্দ্রীয় সার্ভার বা প্রযুক্তিগত কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়লে সাইবার হামলা কিংবা কারিগরি ত্রুটির কারণে একযোগে সব ব্রোকারেজ হাউসের লেনদেন বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে। তাই এ ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় শক্তিশালী বিকল্প সার্ভার, আধুনিক সাইবার নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং স্বাধীন নিরীক্ষা কার্যক্রম নিশ্চিত করার প্রস্তুতি রাখতে হবে।
বিনিয়োগকারীরা সরাসরি যাচাই করতে পারবেন হিসাব
সমন্বিত প্রযুক্তি ব্যবস্থা কার্যকর হলে বিনিয়োগকারীরা ব্যক্তিগত পরিচিতি নম্বর ব্যবহার করে নিজেদের নগদ অর্থের স্থিতি এবং শেয়ার ধারণের তথ্য সরাসরি যাচাই করতে পারবেন। পাশাপাশি হিসাবে অস্বাভাবিক কোনো লেনদেন হলে দ্রুত বার্তা বা ইমেইলের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারীকে সতর্ক করা সম্ভব হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাক-অফিস সফটওয়্যারের অপব্যবহার ও জালিয়াতির মাধ্যমে দেশের ছয়টি বড় ব্রোকারেজ হাউসের বিরুদ্ধে প্রায় ৬০৮ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, মশিউর সিকিউরিটিজের মাধ্যমে ১৬১ কোটি টাকা, তামহা সিকিউরিটিজের মাধ্যমে ১৪০ কোটি টাকা, ব্যাংক সিকিউরিটিজের মাধ্যমে ১২৮ কোটি টাকা, সালতা ক্যাপিটালের মাধ্যমে ১০০ কোটি টাকা, ক্রস্ট সিকিউরিটিজের মাধ্যমে ৬৫ কোটি টাকা এবং শাহ মোহাম্মদ সগীর সিকিউরিটিজের মাধ্যমে ১৪ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এসব গুরুতর অনিয়মের ঘটনা ব্রোকারেজ হাউসগুলোর কার্যক্রমে সার্বক্ষণিক নজরদারি জোরদারের প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে।
ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি অনিয়ম প্রতিরোধে জোর
ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত ১৭ হাজার ৯২৫ জন বিনিয়োগকারী ডিএসইর ‘ইনভেস্টর প্রোটেকশন ফান্ড’ থেকে ২৫০ কোটি টাকার বেশি ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন। এসব দাবির মধ্যে পর্যায়ক্রমে ৭২ কোটি টাকা ছাড় দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও অনিয়মের পর ক্ষতিপূরণ প্রদানকে স্থায়ী সমাধান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং অনিয়ম সংঘটিত হওয়ার আগেই প্রযুক্তির মাধ্যমে তা শনাক্ত ও প্রতিরোধ করাই বিএসইসির প্রস্তাবিত ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
বিদেশের শেয়ারবাজারেও রয়েছে নজরদারি ব্যবস্থা
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শেয়ারবাজারেও ব্রোকারেজ হাউসগুলোর তথ্য এবং গ্রাহকদের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর তদারকি ব্যবস্থা চালু রয়েছে। ভারতের ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ (এনএসই), পাকিস্তানের পিএসএক্স, সিঙ্গাপুরের এমএএস এবং হংকংয়ের এসএফসি নিজ নিজ দেশের ব্রোকারেজ হাউসগুলোর ব্যাক-অফিসের তথ্য ও নগদ অর্থ নিয়মিত নিরীক্ষা এবং তদারকির আওতায় রাখে।
বিএসইসির প্রস্তাবিত সমন্বিত সফটওয়্যার ব্যবস্থা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের শেয়ারবাজারেও ব্রোকারেজ হাউসগুলোর হিসাব পর্যবেক্ষণ আরও কার্যকর হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের অর্থ ও শেয়ারের নিরাপত্তা বাড়ানোর পাশাপাশি জালিয়াতি, অর্থ আত্মসাৎ এবং হিসাবের গরমিল দ্রুত শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
Posted ৯:০১ পিএম | শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬
sharebazar24 | sajed khan
.
.