ব্রেকিং >>
ব্রেকিং >>

আইপিও বিধিমালা সংশোধন: লক-ইন শিথিলের প্রস্তাব বিএসইসির

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬ | 18 বার পঠিত | প্রিন্ট

আইপিও বিধিমালা সংশোধন: লক-ইন শিথিলের প্রস্তাব বিএসইসির
Responsive Ad Banner

নিজস্ব প্রতিবেদক: শেয়ারবাজারে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে তালিকাভুক্ত হতে যাওয়া কোম্পানির শেয়ার বিক্রির নিয়মে বড় পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। প্রস্তাবিত নতুন বিধিমালায় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের বরাদ্দ পাওয়া শেয়ারের ৫০ শতাংশ বিক্রির ক্ষেত্রে কোনো লক-ইন বা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত শেয়ার ধরে রাখার বাধ্যবাধকতা থাকছে না। এর ফলে নতুন তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ার লেনদেন শুরুর প্রথম দিনেই বরাদ্দ পাওয়া শেয়ারের অর্ধেক বিক্রি করার সুযোগ পাবেন তাঁরা।

বিএসইসির প্রকাশিত আইপিও বিধিমালার খসড়ায় লক-ইন ব্যবস্থায় এই পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। বিদ্যমান নিয়মে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের বরাদ্দ পাওয়া শেয়ারের ৫০ শতাংশ বিক্রি করতে ৯০ দিনের লক-ইন অনুসরণ করতে হয়। নতুন প্রস্তাবে সেই বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের একাংশের আশঙ্কা, এই পরিবর্তনের ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিতে পড়তে পারেন এবং নতুন তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ারের দাম নির্ধারণ ও লেনদেনে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।

Responsive Ad Banner

বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে আইপিওর শেয়ারদর নির্ধারণে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। এ পদ্ধতিতে ইস্যুয়ার কোম্পানির মূল্যায়ন, রোড শো এবং বিডিংয়ের মাধ্যমে শেয়ারের দর নির্ধারণ করা হয়। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্ত শেয়ারের প্রাথমিক মূল্য নির্ধারণে বড় প্রভাব ফেলে।

প্রস্তাবিত বিধিমালায় তাঁদের বরাদ্দ পাওয়া শেয়ারের অর্ধেক বিক্রিতে কোনো লক-ইন না থাকলে বেশি দরে বিড করার পরও প্রথম দিনেই শেয়ার বিক্রি করে মুনাফা তুলে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে শেয়ারের দর নির্ধারণে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের একাংশ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক ও শেয়ারবাজার বিশেষজ্ঞ ড. মাহমুদ ওসমান ইমাম মনে করেন, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের শেয়ারে লক-ইন থাকা প্রয়োজন। তাঁর মতে, বিশ্বের উন্নত শেয়ারবাজারেও বিভিন্ন মেয়াদে লক-ইন ব্যবস্থা রয়েছে। দেশীয় বাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সক্ষমতা বিবেচনায় লক-ইনের মেয়াদ কমানো যেতে পারে, তবে বরাদ্দ পাওয়া শেয়ারের ৫০ শতাংশ পুরোপুরি লক-ইনের বাইরে রাখা উচিত নয়।

তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, লক-ইন না থাকলে শেয়ারের দাম নিয়ে কারসাজির সুযোগ তৈরি হতে পারে, যার প্রভাব পড়বে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ওপর। অতীতেও লক-ইন না থাকার সুযোগ কাজে লাগিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

নতুন তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ারের লেনদেনের ক্ষেত্রে সার্কিট ব্রেকার প্রযোজ্য হবে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের ট্রেডিং বিধিমালা অনুযায়ী, তালিকাভুক্তির পর প্রথম দুই দিন শেয়ারের দামের ওপর কোনো মূল্যসীমা না থাকার বিধান ছিল। তবে ২০২১ সালের ১৭ জুন বিএসইসি নির্দেশনা দিয়ে নতুন তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ারের ক্ষেত্রেও সার্কিট ব্রেকার আরোপ করে। এর ফলে আগের দিনের দরের তুলনায় শেয়ারের দাম সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ ওঠানামার সুযোগ রাখা হয়।

কিন্তু নতুন খসড়া বিধিমালায় সার্কিট ব্রেকারের বিষয়টি স্টক এক্সচেঞ্জগুলোর সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এতে নতুন কোম্পানির শেয়ারের লেনদেনে মূল্যসীমা কার্যকর থাকবে কি না, তা এখনো পরিষ্কার নয়।

চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) প্রধান নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাহাদি হাসান জানান, বিএসইসি সার্কিট ব্রেকারের বিষয়টি স্টক এক্সচেঞ্জগুলোর ওপর ছেড়ে দিয়েছে। দীর্ঘদিন নতুন কোনো কোম্পানি বাজারে তালিকাভুক্ত না হওয়ায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। নতুন আইপিও বিধিমালা প্রণয়নের প্রেক্ষাপটে দুই স্টক এক্সচেঞ্জ শিগগিরই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।

শেয়ারবাজারে নতুন তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ার প্রথম দিনেই দুই থেকে তিন গুণ দামে লেনদেন হওয়ার নজির রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে যদি প্রথম দিনের লেনদেনে মূল্যসীমা না থাকে এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা একই দিনে বরাদ্দ পাওয়া শেয়ারের অর্ধেক বিক্রি করতে পারেন, তাহলে তাঁরা বড় অঙ্কের মুনাফা তুলে নেওয়ার সুযোগ পেতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

খসড়া বিধিমালায় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের বরাদ্দ পাওয়া শেয়ারের ৫০ শতাংশে লক-ইন না রাখার প্রস্তাব করা হলেও বাকি ৫০ শতাংশের ক্ষেত্রে লক-ইন বহাল রাখার কথা বলা হয়েছে। তবে সেই লক-ইনের মেয়াদ আগের তুলনায় কমানো হচ্ছে।

২০২৫ সালের বিধিমালা অনুযায়ী, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের বরাদ্দ পাওয়া শেয়ারের ৫০ শতাংশে ৯০ দিন, ২৫ শতাংশে ১২০ দিন এবং অবশিষ্ট ২৫ শতাংশে ১৮০ দিনের লক-ইন রয়েছে। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে প্রথম ৫০ শতাংশ শেয়ারের লক-ইন তুলে দেওয়ার পাশাপাশি পরবর্তী ২৫ শতাংশের ক্ষেত্রে ৬০ দিন এবং অবশিষ্ট ২৫ শতাংশের ক্ষেত্রে ৯০ দিনের লক-ইন রাখার কথা বলা হয়েছে।

অর্থাৎ, নতুন প্রস্তাব কার্যকর হলে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বরাদ্দ পাওয়া শেয়ারের অর্ধেক দ্রুত বিক্রি করতে পারবেন। বাকি অর্ধেকের একটি অংশ ৬০ দিন এবং অন্য অংশ ৯০ দিন ধরে রাখার বাধ্যবাধকতা থাকবে।

লক-ইন তুলে দেওয়ার প্রস্তাবের পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন প্রাইম ব্যাংক সিকিউরিটিজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান। তাঁর মতে, বরাদ্দ পাওয়া শেয়ারের ৫০ শতাংশে লক-ইন না থাকলে বাজারে শেয়ারের সরবরাহ বাড়বে এবং তারল্য প্রবাহ উন্নত হতে পারে।

তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় শেয়ার বিক্রি করতে না পারায় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অর্থ আটকে থাকে। এতে তাঁদের নতুন বিনিয়োগের সক্ষমতা কমে যায়। বিক্রির সুযোগ বাড়লে বিনিয়োগকারীরা অর্থ পুনরায় বিনিয়োগ করতে পারবেন এবং বাজারে তাঁদের অংশগ্রহণ বাড়তে পারে।

শেয়ারের দাম নির্ধারণে কারসাজির আশঙ্কা প্রসঙ্গে মনিরুজ্জামান বলেন, ডাচ অকশন পদ্ধতিতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের নিজেদের বিড করা দরেই শেয়ার কিনতে হবে। তাই তাঁর মতে, এই ব্যবস্থায় কারসাজির সুযোগ থাকার কথা নয়। পাশাপাশি ইস্যুয়ার কোম্পানির আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শেয়ারের দর নির্ধারণ করা হয় বলেও তিনি মত দেন।

লক-ইন ব্যবস্থার পাশাপাশি খসড়া বিধিমালায় বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য শেয়ার বরাদ্দের কোটাও কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। বিদ্যমান ৪০ শতাংশ কোটা কমিয়ে ৩৫ শতাংশ করার কথা বলা হয়েছে।

অন্যদিকে, ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতিতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য আগের মতো ১০ শতাংশ কোটা বহাল রাখার প্রস্তাব রয়েছে। উভয় পদ্ধতিতেই মিউচুয়াল ফান্ডের জন্য ১০ শতাংশ শেয়ার বরাদ্দের ব্যবস্থা অপরিবর্তিত রাখার কথা বলা হয়েছে।

খসড়া বিধিমালার প্রস্তাবগুলো কার্যকর হলে আইপিওতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বিক্রি, লক-ইনের মেয়াদ এবং শেয়ার বরাদ্দের কাঠামোয় পরিবর্তন আসবে। তবে নতুন তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ারে সার্কিট ব্রেকার কীভাবে কার্যকর হবে, সে বিষয়ে স্টক এক্সচেঞ্জগুলোর সিদ্ধান্ত এবং চূড়ান্ত বিধিমালার বিষয়বস্তু বাজারের পরবর্তী পরিস্থিতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

Facebook Comments Box

Posted ৫:৫৭ পিএম | বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬

sharebazar24 |

এ বিভাগের আরও খবর

মো. সাজিদ খান প্রধান সম্পাদক
মো. সিরাজুল ইসলাম সম্পাদক
বার্তা ও সম্পাদকীয় কার্যালয়

৬০/১, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০

হেল্প লাইনঃ 01742-768172

E-mail: sharebazar024@gmail.com