নিজস্ব প্রতিবেদক | বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬ | 13 বার পঠিত | প্রিন্ট
নিজস্ব প্রতিবেদক: শেয়ারবাজারে ব্রোকারেজ হাউসগুলোর অনিয়ম ও আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে নজরদারি জোরদার করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এরই ধারাবাহিকতায় এবার বড় অঙ্কের নেগেটিভ ইকুইটি এবং মার্জিন ঋণ ব্যবস্থাপনায় সম্ভাব্য অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে মার্কেন্টাইল ব্যাংক সিকিউরিটিজ লিমিটেডকে।
প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন বিও (বেনিফিশিয়ারি ওনার্স) হিসাবে বিনিয়োগের বিপরীতে পোর্টফোলিওর মূল্য কমে নেগেটিভ ইকুইটি তৈরি হওয়া এবং এসব হিসাব পরিচালনায় বিধিবিধান অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা বিস্তারিতভাবে অনুসন্ধান করবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। একই সঙ্গে এসব অনিয়মের পেছনে প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারী কিংবা মধ্যস্থতাকারীদের কোনো ভূমিকা ছিল কি না, তাও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে।
এ উদ্দেশ্যে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিএসইসি। কমিশনের মার্কেট ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন বিভাগ থেকে জারি করা এক আদেশে কমিটিকে আগামী ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত কার্যক্রম সম্পন্ন করে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন
বিএসইসির গঠিত তদন্ত কমিটিতে রয়েছেন কমিশনের অতিরিক্ত পরিচালক ড. মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন। কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ আমিরুল ইসলাম ও অমিত অধিকারী।
তদন্তের আওতায় মার্কেন্টাইল ব্যাংক সিকিউরিটিজের প্রতিটি বিও হিসাব আলাদাভাবে পরীক্ষা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ শুধু সামগ্রিক আর্থিক অবস্থার পর্যালোচনায় সীমাবদ্ধ না থেকে কোন গ্রাহকের হিসাবে কী পরিমাণ নেগেটিভ ইকুইটি তৈরি হয়েছে, সংশ্লিষ্ট হিসাবের প্রকৃত সুবিধাভোগী কে এবং এসব হিসাব পরিচালনায় কারা জড়িত ছিলেন, তা শনাক্ত করা হবে।
নেগেটিভ ইকুইটির পেছনে সুবিধাভোগী ও পরিচালকদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হবে
তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, নেগেটিভ ইকুইটিতে চলে যাওয়া বিও হিসাবগুলোর প্রকৃত সুবিধাভোগী কারা। এসব হিসাবের পেছনে প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা বা ভূমিকা ছিল কি না, তা অনুসন্ধান করবে কমিটি।
পাশাপাশি বিও হিসাবধারীদের সঙ্গে মার্কেন্টাইল ব্যাংক সিকিউরিটিজের উদ্যোক্তা, পরিচালক, কর্মকর্তা কিংবা অন্য কোনো মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের গোপন সম্পর্ক ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হবে। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে কোনো ধরনের বিশেষ সুবিধা দেওয়া-নেওয়া বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট লেনদেন হয়েছে কি না, তা শনাক্ত করার নির্দেশ রয়েছে তদন্ত কমিটির প্রতি।
বিএসইসির নির্দেশনার পরও শেয়ার কেনাবেচা হয়েছে কি না
তদন্তে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা লঙ্ঘনের বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বরের পর নেগেটিভ ইকুইটিতে থাকা বিও হিসাবগুলোর বিপরীতে কোনো শেয়ার কেনার আদেশ কার্যকর করা হয়েছিল কি না, তা যাচাই করবে কমিটি।
একই সঙ্গে এসব হিসাব থেকে গ্রাহকদের আত্মীয়স্বজন কিংবা মনোনীত ব্যক্তিদের নামে পরিচালিত অন্য কোনো হিসাবে অর্থ বা শেয়ার স্থানান্তর করা হয়েছে কি না, সেটিও অনুসন্ধান করা হবে।
এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিও হিসাবের লেনদেনের ইতিহাস, অর্থ স্থানান্তরের তথ্য এবং শেয়ার হস্তান্তরের নথিপত্র পরীক্ষা করে সম্ভাব্য অনিয়মের ধরন ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা চিহ্নিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পোর্টফোলিও পুনর্গঠনের প্রস্তাবেও আইনি অসঙ্গতি খুঁজবে কমিশন
মার্কেন্টাইল ব্যাংক সিকিউরিটিজের দেওয়া পোর্টফোলিও পুনর্গঠনের প্রস্তাবও তদন্তের আওতায় রাখা হয়েছে। গত বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠানটি পোর্টফোলিও পুনর্গঠনের যে প্রস্তাব দিয়েছিল, তা প্রচলিত আইন ও বিএসইসির বিধিবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল কি না, তা যাচাই করা হবে।
এ ছাড়া কোনো গ্রাহকের হিসাবে নেগেটিভ ইকুইটি থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট হিসাবের বিপরীতে পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপনা ফি আদায় করা হয়েছে কি না, সেটিও তদন্ত করবে কমিটি।
অর্থাৎ নেগেটিভ ইকুইটিতে থাকা গ্রাহকদের হিসাব পরিচালনা, পোর্টফোলিও পুনর্গঠনের প্রস্তাব এবং এ-সংক্রান্ত ফি আদায়ের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি আইন ও বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করেছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে।
ঋণ, শেয়ারের বাজারমূল্য ও প্রভিশনের হিসাব মিলিয়ে দেখা হবে
তদন্ত কমিটি প্রতিষ্ঠানটির গ্রাহকদের কাছে পাওনা ঋণের পরিমাণ, সংশ্লিষ্ট বিও হিসাবে থাকা শেয়ারের বর্তমান বাজারমূল্য এবং এসব ঋণের বিপরীতে সংরক্ষিত প্রভিশনের (নিরাপত্তা সঞ্চিতি) পরিমাণ যাচাই করবে।
এ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে বাস্তব হিসাবের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করা হবে। একই সঙ্গে বিএসইসির বিধান অনুযায়ী প্রতি দুই মাস অন্তর প্রয়োজনীয় প্রতিবেদন সঠিকভাবে জমা দেওয়া হয়েছিল কি না, সেটিও যাচাইয়ের আওতায় থাকবে।
প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই), চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) এবং সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিডিবিএল) সংরক্ষিত তথ্যের সঙ্গে হিসাব মিলিয়ে দেখবে তদন্ত দল।
অর্থাৎ ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব হিসাব ও প্রতিবেদনই শুধু নয়, সংশ্লিষ্ট তিন প্রতিষ্ঠানের তথ্য-উপাত্তের সঙ্গে সেগুলোর সামঞ্জস্যও পরীক্ষা করা হবে। এর মাধ্যমে গ্রাহকদের ঋণ, শেয়ার ধারণ, লেনদেন ও প্রভিশন সংক্রান্ত তথ্যে কোনো ধরনের গরমিল রয়েছে কি না, তা শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে।
মার্জিন চুক্তি, কেওয়াইসি ও ফোর্সড সেলও তদন্তের আওতায়
এ ছাড়া গ্রাহকদের সঙ্গে সম্পাদিত মার্জিন ঋণ চুক্তিপত্র এবং গ্রাহক পরিচিতি সংক্রান্ত কেওয়াইসি (নো ইওর কাস্টমার) নথিপত্র পর্যালোচনা করবে তদন্ত কমিটি।
গ্রাহকদের জন্য নির্ধারিত ঋণসীমা বা ক্রেডিট লিমিট অতিক্রম করা হয়েছিল কি না, কোনো ক্ষেত্রে নিয়মবহির্ভূতভাবে ঋণসুবিধা দেওয়া হয়েছে কি না এবং গ্রাহকদের শেয়ার বাধ্যতামূলকভাবে বিক্রি বা ফোর্সড সেল করার ক্ষেত্রে যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তাও যাচাই করা হবে।
পাশাপাশি মার্কেন্টাইল ব্যাংক সিকিউরিটিজের পরিচালনা পর্ষদের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত এবং প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা বা অডিট প্রতিবেদনও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করবে বিএসইসির তদন্ত দল।
সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটির নেগেটিভ ইকুইটি সৃষ্টির কারণ, মার্জিন ঋণ বিতরণ ও ব্যবস্থাপনা, গ্রাহকদের হিসাব পরিচালনা, অর্থ ও শেয়ার স্থানান্তর, পোর্টফোলিও পুনর্গঠন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা পালনের বিষয়গুলো তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে।
কমিটির জন্য নির্ধারিত ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত শেষ করে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা রয়েছে। তদন্তে কোনো অনিয়ম বা বিধিবিধান লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া যায় কি না, এখন সেদিকেই নজর থাকবে পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্টদের।
Posted ৫:২২ পিএম | বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬
sharebazar24 | sajed khan
.
.