নিজস্ব প্রতিবেদক | সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬ | 27 বার পঠিত | প্রিন্ট
নিজস্ব প্রতিবেদক: জ্বালানি সরবরাহে সংকট, উৎপাদন ও পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি এবং ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা ও চাহিদায় দুর্বলতার প্রভাব পড়েছে দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর আর্থিক ফলাফলে। চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে অধিকাংশ বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের মুনাফা কমেছে। একই সময়ে কয়েকটি কোম্পানি লোকসানের মুখে পড়েছে। ফলে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলমান প্রতিকূল পরিস্থিতির প্রভাব বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর আয়-ব্যয়ের হিসাবেও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তালিকাভুক্ত ১৩টি বহুজাতিক কোম্পানির জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৬ সময়ের আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, ছয়টি প্রতিষ্ঠানের মুনাফা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে। অন্যদিকে চারটি কোম্পানি লোকসানে রয়েছে। অর্থাৎ মোট ১০টি বহুজাতিক কোম্পানির আর্থিক ফলাফলে নেতিবাচক পরিস্থিতি দেখা গেছে।
মুনাফায় সবচেয়ে বড় পতন বিএটিবিসির
মুনাফা অর্জনকারী বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পতনের মুখে পড়েছে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ (বিএটিবিসি) লিমিটেড। চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে কোম্পানিটির মুনাফা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬৭ শতাংশ কমেছে।
প্রকাশিত আর্থিক তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে বিএটিবিসির মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৯৯ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। অথচ আগের বছরের একই সময়ে কোম্পানিটির মুনাফা ছিল ৩০৫ কোটি ৪ লাখ টাকা। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা কমেছে ২০৫ কোটি ২১ লাখ টাকা।
কোম্পানিটির পক্ষ থেকে মুনাফায় বড় ধরনের পতনের প্রধান কারণ হিসেবে বিক্রির পরিমাণ কমে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। বিক্রি কমার প্রভাব সরাসরি প্রতিষ্ঠানটির সামগ্রিক আর্থিক ফলাফলে পড়েছে।
লাফার্জহোলসিম ও ইউনিলিভারের মুনাফায় বড় পতন
বহুজাতিক সিমেন্ট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশের মুনাফাও উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে কোম্পানিটির মুনাফা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৭ শতাংশ কমে ৬৩ কোটি ৯ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে ভোগ্যপণ্য খাতের বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ইউনিলিভার কনজ্যুমার কেয়ারের মুনাফায়ও বড় ধরনের নেতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে কোম্পানিটির মুনাফা ৩৩ শতাংশ কমে ১৬ কোটি ৪২ লাখ টাকায় নেমেছে।
ব্যয় বৃদ্ধির চাপে লিন্ডে বাংলাদেশ
শিল্প খাতের বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান লিন্ডে বাংলাদেশের মুনাফাও কমেছে। চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে কোম্পানিটির মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৭ কোটি ৯৬ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৯ শতাংশ কম।
মুনাফা কমে যাওয়ার পেছনে জ্বালানি ও বিদ্যুতের উচ্চ ব্যয়ের পাশাপাশি পণ্য বিতরণ খরচ বৃদ্ধিকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে কোম্পানিটি। এসব খাতে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা অর্জনের সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।
মারিকো ও গ্রামীণফোনের মুনাফাও কিছুটা কমেছে
তৃতীয় প্রান্তিকে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর মধ্যে মারিকো বাংলাদেশ ও গ্রামীণফোনের মুনাফা আগের বছরের তুলনায় সামান্য কমেছে। তবে বড় ধরনের পতন না হওয়ায় কোম্পানি দুটির মুনাফা প্রায় স্থিতিশীল রয়েছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে মারিকো বাংলাদেশের মুনাফা হয়েছে ১৫৩ কোটি ৪২ লাখ টাকা। একই সময়ে টেলিযোগাযোগ খাতের বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান গ্রামীণফোনের মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৭৫০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা।
আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় উভয় প্রতিষ্ঠানের মুনাফায় সামান্য পতন হলেও অন্যান্য কয়েকটি বহুজাতিক কোম্পানির তুলনায় তাদের মুনাফার অবস্থান অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল রয়েছে।
লোকসানে চার বহুজাতিক কোম্পানি
মুনাফা অর্জনকারী ছয়টি কোম্পানির পাশাপাশি চারটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রতিবেদনে লোকসানের চিত্র উঠে এসেছে। এর মধ্যে সিঙ্গার বাংলাদেশের লোকসান সবচেয়ে বেশি। অন্যদিকে হাইডেলবার্গ ম্যাটেরিয়ালস বাংলাদেশ আগের বছরের মুনাফার অবস্থান থেকে লোকসানে নেমেছে। তবে আরএকে সিরামিকস ও বাটা শুর লোকসান আগের বছরের তুলনায় কিছুটা কমেছে।
সিঙ্গার বাংলাদেশের লোকসান বেড়েছে ৬১ শতাংশের বেশি
চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি লোকসান করেছে সিঙ্গার বাংলাদেশ। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে কোম্পানিটির লোকসান দাঁড়িয়েছে ৭৭ কোটি ১৬ লাখ টাকা। আগের বছরের একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটির লোকসান ছিল ৪৭ কোটি ৯৩ লাখ টাকা।
অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির লোকসান বেড়েছে ২৯ কোটি ২৩ লাখ টাকা বা ৬১ শতাংশের বেশি।
তবে আলোচ্য সময়ে সিঙ্গার বাংলাদেশের আয় আগের বছরের তুলনায় ৭ শতাংশ বেড়েছে। আয় বাড়লেও উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ভোক্তা ইলেকট্রনিকস পণ্যের বাজারে স্থবিরতা এবং বিপুল অর্থায়ন ব্যয়ের কারণে কোম্পানিটি লোকসান কমাতে পারেনি।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আলোচ্য প্রান্তিকে প্রতিষ্ঠানটির নিট অর্থায়ন ব্যয় হয়েছে ৭৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। এই বিপুল অর্থায়ন ব্যয় কোম্পানিটির সামগ্রিক আর্থিক ফলাফলের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে।
মুনাফা থেকে লোকসানে হাইডেলবার্গ ম্যাটেরিয়ালস
তৃতীয় প্রান্তিকে আর্থিক অবস্থার অবনতি হয়েছে সিমেন্ট খাতের বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান হাইডেলবার্গ ম্যাটেরিয়ালস বাংলাদেশেরও। আগের বছরের একই সময়ে মুনাফা করলেও চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে কোম্পানিটি লোকসানে পড়েছে।
প্রকাশিত আর্থিক তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে হাইডেলবার্গ ম্যাটেরিয়ালস বাংলাদেশের লোকসান হয়েছে ২০ কোটি ৪১ লাখ টাকা। অথচ আগের বছরের একই সময়ে কোম্পানিটির মুনাফা ছিল ৯২ লাখ টাকা।
অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির আর্থিক ফলাফলে ২১ কোটি ৩৩ লাখ টাকার নেতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।
আরএকে সিরামিকস ও বাটা শুর লোকসান কমেছে
অন্যদিকে লোকসানে থাকা বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর মধ্যে আরএকে সিরামিকস বাংলাদেশ ও বাটা শুর আর্থিক ফলাফলে কিছুটা উন্নতি দেখা গেছে। যদিও প্রতিষ্ঠান দুটি এখনো লোকসান থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি।
চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে আরএকে সিরামিকস বাংলাদেশের লোকসান হয়েছে ৫ কোটি ৯ লাখ টাকা। তবে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কোম্পানিটির লোকসানের পরিমাণ কমেছে।
একইভাবে বহুজাতিক জুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বাটা শুর লোকসানও আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। চলতি বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে কোম্পানিটির লোকসান দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি টাকা। আগের বছরের একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটির লোকসান ছিল ১৪ কোটি ৪৪ লাখ টাকা।
সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে বাটা শুর লোকসান কমেছে ৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। তবে লোকসান কমলেও কোম্পানিটি এখনো মুনাফায় ফিরতে পারেনি।
জ্বালানি সংকটে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর মুনাফায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল জ্বালানি সংকট। বিশেষ করে গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাভাবিক উৎপাদন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বাড়ায় উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে।
জুলাই মাসের শেষ দিকে মহেশখালীর কাছে এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এর ফলে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হয়।
এতে দেশে গ্যাসের সংকট আরও তীব্র হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে বিদ্যুতের সরবরাহেও বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, একপর্যায়ে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ৩ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়।
গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে বিকল্প ব্যবস্থায় উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়েছে। বিশেষ করে ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভরতা বাড়ায় উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
এর পাশাপাশি বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ার প্রভাবও দেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর পড়েছে। এসব কারণে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর উৎপাদন, পরিচালন ও পণ্য বিতরণ ব্যয় বেড়েছে।
বিক্রি ধরে রেখেও মুনাফা ধরে রাখতে পারছে না অনেক কোম্পানি
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি ভোক্তা চাহিদার দুর্বলতা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতিও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে ভোগ্যপণ্য ও ভোক্তা ইলেকট্রনিকস খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারে প্রত্যাশিত চাহিদা পাচ্ছে না।
অন্যদিকে উৎপাদন ও পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান বিক্রি ও আয় ধরে রাখতে সক্ষম হলেও সেই অনুপাতে মুনাফা অর্জন করতে পারছে না। সিঙ্গার বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আয় বৃদ্ধির পরও বড় অঙ্কের লোকসান হওয়ার ঘটনা এ পরিস্থিতির একটি উদাহরণ।
সার্বিকভাবে তৃতীয় প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ১৩টি বহুজাতিক কোম্পানির মধ্যে ১০টির আর্থিক ফলাফলে মুনাফা হ্রাস কিংবা লোকসানের চিত্র রয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি কোম্পানি মুনাফা করলেও আগের বছরের তুলনায় আয় কমেছে এবং চারটি প্রতিষ্ঠান লোকসানে রয়েছে।
তবে লোকসানে থাকা আরএকে সিরামিকস ও বাটা শুর আর্থিক ফলাফলে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। অন্যদিকে বিএটিবিসি, লাফার্জহোলসিম ও ইউনিলিভার কনজ্যুমার কেয়ারের মুনাফায় উল্লেখযোগ্য পতন হয়েছে।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, শিল্প খাতে জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা, উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং ভোক্তা চাহিদা পুনরুদ্ধার করা না গেলে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর মুনাফার ওপর চাপ অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে সামগ্রিক ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নতি এসব প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ আর্থিক ফলাফলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
Posted ৫:৫৮ পিএম | সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬
sharebazar24 | sajed khan
.
.