নিজস্ব প্রতিবেদক | বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২৬ | 21 বার পঠিত | প্রিন্ট
নিজস্ব প্রতিবেদক: শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত প্রিমিয়ার ব্যাংকের গত সাত বছরের আর্থিক কার্যক্রমে বড় ধরনের অনিয়ম ও জালিয়াতির চিত্র উঠে এসেছে। ফরেনসিক নিরীক্ষায় দেখা গেছে, ২০১৮ সাল থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন কৌশলে মোট ৩ হাজার ৮৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট প্রতিষ্ঠান এমএবিএস অ্যান্ড জে পার্টনারস এই ফরেনসিক অডিট পরিচালনা করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার পর ২০২৫ সালের আগস্টে বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদনে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়, যা ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রতিবেদন জমা দেয়।
তদন্তে উঠে এসেছে, ব্যাংকের জেনারেল সার্ভিসেস ডিভিশন, ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ডিভিশন এবং বনানী শাখার মাধ্যমে এই অর্থ আত্মসাতের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এতে সাবেক চেয়ারম্যান এইচবিএম ইকবাল, তার দুই ছেলে সাবেক পরিচালক মঈন ইকবাল ও ইমরান ইকবাল, কয়েকজন সাবেক পরিচালক এবং শীর্ষ কর্মকর্তাসহ ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, অফিস ভাড়া সংক্রান্ত খাতেই সবচেয়ে বড় অনিয়ম হয়েছে। ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইকবাল পরিবারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে উচ্চমূল্যে চুক্তির মাধ্যমে ৪০৬ কোটি ৩৫ লাখ টাকার বেশি আত্মসাৎ করা হয়েছে। যেখানে বাজারদর প্রতি বর্গফুট ১২০ থেকে ১৬০ টাকা, সেখানে ইকবাল সেন্টারের জন্য ৩৫০ থেকে ৫০৬ টাকা পর্যন্ত ভাড়া নির্ধারণ করা হয়। এর ফলে ব্যাংকের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৭১৯ কোটি ৮৮ লাখ টাকা।
এছাড়া সিএসআর, বিজ্ঞাপন, প্রচারণা এবং ব্যবসা উন্নয়ন খাতে অনিয়মের মাধ্যমে আরও ৬০৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। ১২৮ কোটি টাকার সিএসআর ব্যয়ের মধ্যে কম্বল, ত্রাণ ও অনুদানের বড় অংশ বাস্তবে বিতরণ করা হয়নি। একই সঙ্গে পাঁচটি ভেন্ডর অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে ৭৪ কোটি ৪৯ লাখ টাকা সরিয়ে নেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
ফরেনসিক প্রতিবেদনে ‘সান্ড্রি ডেবটরস’ অ্যাকাউন্টকে অর্থ আত্মসাতের প্রধান মাধ্যম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই অ্যাকাউন্ট থেকে ৬৬৭ কোটি ১৫ লাখ টাকা বিভিন্ন ভেন্ডর ও প্রতিষ্ঠানের কাছে স্থানান্তর করা হয়। পরবর্তীতে ২২টি ভেন্ডর ও একটি ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ৬৫৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা আত্মসাৎ নিশ্চিত করা হয়েছে।
প্রিন্টিং ও স্টেশনারি খাতে ১২৯ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হলেও প্রকৃত সরবরাহ ছিল মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ। এতে ৮১ কোটি ৭৩ লাখ টাকা আত্মসাৎ হয়েছে, যার বড় অংশ একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অতিরিক্ত বিল দেখিয়ে নেওয়া হয়েছে।
এছাড়া বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল)-এর খুলনা টাইগার্স ফ্র্যাঞ্চাইজি সংশ্লিষ্ট ব্যয়ে ৪৪ কোটি ৯৯ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। যেখানে প্রকৃত ব্যয় ছিল মাত্র ৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে ৩ কোটি ৩৫ লাখ টাকা প্রদান করা হলেও অবশিষ্ট অর্থ অনিয়মের মাধ্যমে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
নিরীক্ষায় আরও দেখা গেছে, অফিস ইন্টেরিয়র, নির্মাণ, সংস্কার, ভবন মেরামত, ব্যবসা উন্নয়ন ও টেলিভিশন বিজ্ঞাপনের খাতে অতিরিক্ত বা ভুয়া ব্যয় দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
এদিকে, আত্মসাৎ হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারে ব্যাংকটি ইতোমধ্যে একাধিক মামলা দায়ের করেছে। ১১ মার্চ প্রিমিয়ার ব্যাংক ফাউন্ডেশনের নামে ৩৫ কোটি টাকার একটি মামলা করা হয়। এছাড়া ১৫ মার্চ অফিস ভাড়া ও ভেন্ডর খাতে আত্মসাৎ হওয়া ৩ হাজার ৫৩ কোটি ৭৯ লাখ টাকা উদ্ধারে আরও দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, সাবেক চেয়ারম্যান এইচবিএম ইকবাল একজন সাবেক সংসদ সদস্য ছিলেন এবং ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর টানা ২৬ বছর ব্যাংকটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে পদত্যাগ করেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০২৪ সালের আগস্টে তিনি দেশত্যাগ করেছেন বলে জানা গেছে।
Posted ৭:৩০ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২৬
sharebazar24 | sajed khan
.
.