নিজস্ব প্রতিবেদক | রবিবার, ১০ মে ২০২৬ | 1 বার পঠিত | প্রিন্ট
নিজস্ব প্রতিবেদক: পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের অদাবিকৃত লভ্যাংশ, অবণ্টিত শেয়ার এবং আইপিও সংক্রান্ত অর্থ সুরক্ষায় বড় ধরনের সংস্কার আনতে যাচ্ছে সরকার। এ লক্ষ্যে কেন্দ্রীয়ভাবে অর্থ সংরক্ষণের পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের দাবি চিরস্থায়ীভাবে বহাল রাখার বিধান যুক্ত করা হচ্ছে, যাতে বৈধ দাবিদাররা যে কোনো সময় তাদের প্রাপ্য ফেরত নিতে পারেন।
একই সঙ্গে তহবিলের অর্থ নিরাপদ রাখতে শেয়ারবাজার বা অন্য কোনো ঝুঁকিপূর্ণ খাতে বিনিয়োগের সুযোগ বন্ধ করার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
এ উদ্দেশ্যে ‘ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড’ (সিএমএসএফ) সম্পর্কিত নীতিমালায় বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ইতোমধ্যে ‘ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড অধ্যাদেশ, ২০২৬’-এর একটি খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে, যেখানে এসব বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, অদাবিকৃত বা অবণ্টিত লভ্যাংশ মূলত বিনিয়োগকারীদের অর্থ। তাই এই অর্থ কোনোভাবেই ঝুঁকিপূর্ণ খাতে বিনিয়োগ করা উচিত নয়। তারা অভিযোগ করেন, আগের কমিশনের সময়ে তহবিলের অর্থ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল এবং সেই অর্থ দিয়ে একটি মিউচুয়াল ফান্ডও গঠন করা হয়, যা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০২১ সালে গঠিত হয় ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড। বর্তমানে এই তহবিলে নগদ প্রায় এক হাজার কোটি টাকা এবং সমপরিমাণ বোনাস শেয়ার জমা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বিনিয়োগকারীকে দাবি অনুযায়ী নগদ ও শেয়ার মিলিয়ে প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।
তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তহবিলটির কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দেয়। সে সময় পরিচালনা পর্ষদের কয়েকজন সদস্য পলাতক বা কারাগারে রয়েছেন। পাশাপাশি তহবিলের অর্থ তছরুপের অভিযোগও ওঠে। এসব কারণেই বিনিয়োগকারীদের অর্থ সুরক্ষায় নতুন করে নীতিমালা সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিন বছর অদাবিকৃত থাকলেই তহবিলে জমা
খসড়া অধ্যাদেশ অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত কোম্পানির কাছে তিন বছর বা তার বেশি সময় ধরে পড়ে থাকা নগদ ও স্টক লভ্যাংশ, বোনাস ও রাইট শেয়ার, এমনকি আইপিওর অবণ্টিত অর্থও সিএমএসএফে স্থানান্তর করতে হবে। একইসঙ্গে তালিকাচ্যুত কোম্পানির অবণ্টিত অর্থও এই তহবিলের আওতায় আনা হবে।
এতে আরও বলা হয়েছে, বিনিয়োগকারী বা তার বৈধ উত্তরাধিকারীর দাবি কখনোই বাতিল হবে না। যথাযথ প্রমাণ উপস্থাপন করলে যে কোনো সময় তহবিল থেকে অর্থ বা শেয়ার ফেরত পাওয়া যাবে। ফলে দীর্ঘদিন অদাবিকৃত থাকা অর্থ হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে না।
খসড়ায় বলা হয়েছে, নগদ অর্থ তহবিলের ব্যাংক হিসাবে এবং শেয়ার ডিপোজিটরি অ্যাকাউন্টে সংরক্ষণ করা হবে। এছাড়া সরকার বা অনুমোদিত অন্য উৎস থেকে পাওয়া অনুদানও তহবিলে যুক্ত করা যাবে।
নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দাবি নিষ্পত্তি
নতুন অধ্যাদেশে দাবি নিষ্পত্তির জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমাও নির্ধারণ করা হয়েছে। কোনো বিনিয়োগকারী দাবি উত্থাপন করলে সংশ্লিষ্ট ইস্যুয়ার প্রতিষ্ঠানকে ১৫ দিনের মধ্যে তা যাচাই করে তহবিলে সুপারিশ পাঠাতে হবে। পরে তহবিল কর্তৃপক্ষ আরও ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে অর্থ বা শেয়ার পরিশোধ করবে।
খসড়া অনুযায়ী, সিএমএসএফ একটি সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত হবে। এর প্রধান কার্যালয় ঢাকায় থাকবে এবং প্রয়োজনে দেশের অন্যান্য স্থানেও শাখা খোলা যাবে। তহবিল নিজ নামে সম্পদ অর্জন, সংরক্ষণ ও হস্তান্তর করতে পারবে এবং আইনগত কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষমতাও পাবে।
বোর্ড গঠন ও স্বচ্ছতার বিধান
তহবিল পরিচালনার জন্য একটি বোর্ড অব গভর্নরস গঠন করা হবে। এতে চেয়ারম্যান হিসেবে থাকবেন পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার চেয়ারম্যান। এছাড়া অর্থ মন্ত্রণালয়, বিএসইসি, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস ইনস্টিটিউট, স্টক এক্সচেঞ্জ এবং তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংগঠনের প্রতিনিধিরা সদস্য থাকবেন। তহবিলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
স্বচ্ছতা নিশ্চিতে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মান (আইএফআরএস) অনুযায়ী হিসাব প্রস্তুত ও নিরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অর্থবছর শেষ হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নিরীক্ষা সম্পন্ন করতে হবে। পাশাপাশি সব অদাবিকৃত অর্থ ও শেয়ারের তথ্য সংরক্ষণে কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ তৈরির কথাও বলা হয়েছে।
ব্যাংকে থাকবে অর্থ, মুনাফায় কর
অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, খসড়া অধ্যাদেশ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। বিনিয়োগকারীদের অর্থ পুরোপুরি নিরাপদ রাখতে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ নিষিদ্ধ করা হচ্ছে এবং সব অর্থ ব্যাংকে সংরক্ষণ করা হবে।
তিনি বলেন, ব্যাংকে জমা অর্থ থেকে অর্জিত মুনাফা বিনিয়োগ শিক্ষা কার্যক্রমে ব্যয়ের সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে তহবিলের মূল অর্থ কোনোভাবেই ব্যয় করা যাবে না। বৈধ দাবিদার চাইলে তা ফেরত দিতে হবে।
তিনি আরও জানান, শুরুতে পুরো তহবিলকে আয়করমুক্ত রাখার চিন্তা থাকলেও পরে সংশোধন এনে ব্যাংক মুনাফার ওপর কর আরোপের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ঝুঁকিমুক্ত বিনিয়োগের দাবি সংশ্লিষ্টদের
ডিএসইর এক সদস্য বলেন, স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড গঠনের উদ্যোগ ভালো ছিল, তবে পরবর্তী সময়ে কিছু ভুল সিদ্ধান্তের কারণে তহবিলের অর্থ ঝুঁকিতে পড়ে। বিশেষ করে শেয়ারবাজারে এই অর্থ বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত ছিল বড় ভুল।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না—এমন খাতে বিনিয়োগকারীদের অর্থ রাখা উচিত নয়। তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী, তহবিলের অর্থ ট্রেজারি বন্ড বা নির্ভরযোগ্য ব্যাংকের এফডিআরে রাখা উচিত।
অন্যদিকে, ডিএসইর পরিচালক রিচার্ড ডি রোজারিও ব্যক্তিগত মতামতে বলেন, এ ধরনের তহবিলের প্রয়োজনীয়তা নিয়েই প্রশ্ন রয়েছে। বরং কোম্পানিগুলো যেন সঠিকভাবে বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ বিতরণ করে, সে বিষয়ে চাপ সৃষ্টি করা উচিত।
তিনি বলেন, অতীতে তহবিলের অর্থ দিয়ে মিউচুয়াল ফান্ড গঠন এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অর্থ স্থানান্তরের ঘটনা ঘটেছে। তাই এই অর্থ কেবল নিরাপদ ব্যাংক আমানত হিসেবেই রাখা উচিত, কোনো ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগে নয়।
Posted ৯:৪১ অপরাহ্ণ | রবিবার, ১০ মে ২০২৬
sharebazar24 | sajed khan
.
.