শেয়ারবাজারে নজরদারিতে বড় পরিবর্তন, এআই দেবে স্বয়ংক্রিয় সতর্ক সংকেত

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | 19 বার পঠিত | প্রিন্ট

শেয়ারবাজারে নজরদারিতে বড় পরিবর্তন, এআই দেবে স্বয়ংক্রিয় সতর্ক সংকেত
Responsive Ad Banner

নিজস্ব প্রতিবেদক: শেয়ারবাজারে কারসাজি, অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং সন্দেহজনক লেনদেন দ্রুত শনাক্ত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইনির্ভর স্বয়ংক্রিয় নজরদারি ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জকে (ডিএসই) আগামী এক বছরের মধ্যে বিদ্যমান সার্ভিল্যান্স ব্যবস্থা এআইভিত্তিক ব্যবস্থায় রূপান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় কোনো শেয়ারের দাম, লেনদেনের পরিমাণ কিংবা লেনদেনের ধরনে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সতর্ক সংকেত বা ‘রেড ফ্ল্যাগ’ তৈরি হবে। পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্রুত লেনদেন বন্ধ বা স্থগিত করার সুযোগও তৈরি হতে পারে। এতে বাজার পর্যবেক্ষণের গতি বাড়ার পাশাপাশি মানুষের সুযোগসন্ধানী হস্তক্ষেপ ও সম্ভাব্য পক্ষপাত কমানোর সুযোগ থাকবে।

Responsive Ad Banner

তবে শুধু এআই সফটওয়্যার স্থাপন করলেই এ ধরনের নজরদারি ব্যবস্থা কার্যকর হবে না। বাংলাদেশের বর্তমান শেয়ারবাজার অবকাঠামোয় এআইভিত্তিক সার্ভিল্যান্স চালু করতে বিপুল পরিমাণ নির্ভরযোগ্য ও তাৎক্ষণিক তথ্য, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্যভান্ডারের মধ্যে সমন্বয়, গ্রাহকের পূর্ণাঙ্গ কেওয়াইসি তথ্য, শক্তিশালী প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, সাইবার নিরাপত্তা এবং দক্ষ জনবল প্রয়োজন হবে।

বর্তমানে যেভাবে নজরদারি করা হয়

বর্তমানে ডিএসইর সার্ভিল্যান্স বিভাগ রিয়েল-টাইম বাজার তথ্য পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে অস্বাভাবিক মূল্য ও লেনদেনের গতিবিধি শনাক্ত করে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত জুন থেকে প্রায় এক দশক পর রিয়েল-টাইম সার্ভিল্যান্সের ভিত্তিতে কয়েকটি কোম্পানির লেনদেন সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়েছে। সোনারগাঁও টেক্সটাইলস, শ্যামপুর সুগার মিলস এবং বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্সের শেয়ারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির পর এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

বর্তমান ব্যবস্থায় কোনো শেয়ারে অস্বাভাবিকতা শনাক্ত হলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির কাছে কোনো অপ্রকাশিত মূল্য সংবেদনশীল তথ্য বা পিএসআই রয়েছে কি না, তা জানতে চাওয়া হয়। এরপর সন্দেহজনক লেনদেন কিংবা কারসাজির ঘটনা ঘটেছে কি না, তা তদন্ত করা হয়। অর্থাৎ প্রযুক্তি প্রাথমিক সংকেত দিতে পারলেও চূড়ান্ত যাচাই ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে মানুষের ভূমিকা এখনও গুরুত্বপূর্ণ।

সম্প্রতি স্টার অ্যাডহেসিভসের শেয়ারে অস্বাভাবিক লেনদেন শনাক্ত হওয়ার পর ডিএসইর সার্ভিল্যান্স প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বিএসইসি তদন্ত করে। তদন্তে সিরিজ ট্রেডিংয়ের মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে শেয়ারের চাহিদা তৈরির অভিযোগ উঠে। এ ঘটনায় এফএ ট্রেডিং করপোরেশনকে জরিমানা করা হয়।

এআই চালু হলে যেসব পরিবর্তন আসতে পারে

ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ আয়োজিত এক উন্মুক্ত আলোচনায় বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান জানান, আগামী এক বছরের মধ্যে ডিএসইকে এআইভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় সার্ভিল্যান্স ব্যবস্থায় যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় স্বয়ংক্রিয় ট্রিগারের মাধ্যমে সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

বিএসইসি সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কার্যকর এআই সার্ভিল্যান্স শুধু শেয়ারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি শনাক্ত করবে না। এটি লেনদেনের পরিমাণ ও ঘনত্ব, একই ব্যক্তি বা সংশ্লিষ্ট একাধিক হিসাবের লেনদেনের ধরন, একই সময়ে কেনাবেচা, সম্ভাব্য ওয়াশ ট্রেড, সার্কুলার ট্রেডিং, ইনসাইডার ট্রেডিংয়ের সম্ভাব্য ধরন, ফ্রন্ট-রানিং, পাম্প অ্যান্ড ডাম্প এবং ব্রোকার বা অনুমোদিত প্রতিনিধির অস্বাভাবিক কার্যক্রম বিশ্লেষণেও সহায়তা করতে পারবে।

এ ছাড়া কোনো কোম্পানির প্রকাশিত তথ্য ও মূল্য সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশের সময়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শেয়ারের লেনদেনের সম্পর্কও বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে। ফলে শুধু শেয়ারের দাম ও লেনদেন নয়, বাজারে অংশগ্রহণকারীদের আচরণ এবং তাদের পারস্পরিক সম্পর্কও বিশ্লেষণের আওতায় আসতে পারে।

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কেওয়াইসি তথ্য

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এআইভিত্তিক সার্ভিল্যান্স ব্যবস্থা চালুর ক্ষেত্রে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো গ্রাহকের কেওয়াইসি তথ্যের সঙ্গে বাজারের লেনদেনের তথ্য সমন্বয় করা। প্রতিবেদনে ডিএসইর একজন পরিচালকের বক্তব্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, বর্তমান সার্ভিল্যান্স প্ল্যাটফর্ম গ্রাহকের কেওয়াইসি তথ্যের সঙ্গে সমন্বিত নয়।

কোনো এআই কোনো শেয়ারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ার বিষয়টি শনাক্ত করতে পারলেও প্রকৃত কারসাজিকারীদের চিহ্নিত করতে হলে জানতে হবে কারা ওই শেয়ার কিনেছে, তাদের মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না এবং একাধিক হিসাব একই প্রকৃত সুবিধাভোগী বা বেনিফিশিয়াল ওনারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে কি না।

এ কারণে কার্যকর এআই সার্ভিল্যান্স ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ডিএসইর লেনদেনের তথ্যের সঙ্গে সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড, বিএসইসি এবং ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রয়োজনীয় তথ্য সমন্বয় করা জরুরি। একই সঙ্গে ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের ব্যাক-অফিস সফটওয়্যারে গ্রাহকের হিসাব, লেনদেন ও সিকিউরিটিজ হোল্ডিংয়ের তথ্য পরিবর্তন বা গোপন করা হয়েছে কি না, সেটিও নজরদারির আওতায় আনতে হবে।

এআই স্থাপনে প্রয়োজন শক্তিশালী অবকাঠামো

এআইভিত্তিক সার্ভিল্যান্স কার্যকর করতে প্রথমেই প্রয়োজন রিয়েল-টাইম তথ্য অবকাঠামো। ডিএসইর প্রতিটি আদেশ, লেনদেন, মূল্য, পরিমাণ এবং সময়ের তথ্য দ্রুত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের সক্ষমতা থাকতে হবে।

এর পাশাপাশি প্রয়োজন তথ্যের সমন্বিত সংযোগ। ডিএসই, সিএসই, সিডিবিএল, ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান ও বিএসইসির প্রয়োজনীয় তথ্য নিরাপদ কাঠামোর মধ্যে যুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে এমন এআই ও মেশিন-লার্নিং মডেল প্রয়োজন, যা শুধু নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করলেই সতর্কবার্তা দেবে না; বরং স্বাভাবিক লেনদেনের ধরন থেকে অস্বাভাবিক বিচ্যুতিও শনাক্ত করতে পারবে।

এআই কোনো লেনদেনকে সন্দেহজনক হিসেবে শনাক্ত করার পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা যেন একই প্ল্যাটফর্মে লেনদেন, হিসাব, মালিকানা এবং কোম্পানির তথ্য দেখতে পারেন, এমন সমন্বিত ব্যবস্থা প্রয়োজন। পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা ও অডিট ট্রেইল নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। এআই কেন কোনো লেনদেনকে সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং এরপর কোন কর্মকর্তা কী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তার রেকর্ড সংরক্ষণ করতে হবে।

পুরোপুরি এআইনির্ভর সিদ্ধান্তের ঝুঁকি

শেয়ারবাজারের নজরদারিতে এআই ব্যবহারের অন্যতম লক্ষ্য মানুষের হস্তক্ষেপ কমানো হলেও মানুষকে পুরোপুরি বাদ দেওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। কোনো কোম্পানির শেয়ারের দাম দ্রুত বাড়লেও এর পেছনে যৌক্তিক ব্যবসায়িক কারণ থাকতে পারে। এআই সেটিকে সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে লেনদেন বন্ধ করে দিলে স্বাভাবিক বাজার কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অন্যদিকে কারসাজি যদি ধীরে ধীরে বা একাধিক ভিন্ন হিসাব ব্যবহার করে পরিচালিত হয়, তাহলে সেটিও সবসময় নির্ধারিত কোনো প্যাটার্নে ধরা নাও পড়তে পারে। ফলে এআইভিত্তিক ব্যবস্থায় স্বাভাবিক লেনদেনকে ভুলভাবে সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত করার পাশাপাশি প্রকৃত কারসাজি শনাক্ত না হওয়ার ঝুঁকিও থাকতে পারে।

ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ারের বক্তব্য অনুযায়ী, এআইয়ের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত বাজার বিশ্লেষকদের কাজে সহায়তা করা, তাদের পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করা নয়। কোনো অস্বাভাবিক লেনদেন শনাক্ত হলে এআই দ্রুত সতর্ক সংকেত দেবে। এরপর বিশ্লেষকরা তথ্য যাচাই করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবেন।

বিনিয়োগকারীদের জন্য সুবিধা ও ঝুঁকি

এআইভিত্তিক সার্ভিল্যান্স কার্যকরভাবে চালু হলে বিনিয়োগকারীদের জন্য দ্রুত সতর্কতা এবং বাজারের অস্বাভাবিক কার্যক্রম শনাক্তের সুযোগ বাড়তে পারে। কোনো শেয়ারে সন্দেহজনক লেনদেন দেখা দিলে দ্রুত সংকেত পাওয়া গেলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অনাকাঙ্ক্ষিত ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।

তবে ভুল সংকেতের কারণে স্বাভাবিক লেনদেন বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিও থাকবে। অতিরিক্ত স্বয়ংক্রিয়তার ফলে প্রতিটি সতর্কবার্তার পর দ্রুত লেনদেন বন্ধ করা হলে বাজারে অপ্রয়োজনীয় অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। আবার অসম্পূর্ণ বা পুরোনো কেওয়াইসি তথ্য এআইয়ের বিশ্লেষণকে দুর্বল করতে পারে। এর পাশাপাশি সাইবার হামলা এবং পুরোনো তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি মডেলের সম্ভাব্য সীমাবদ্ধতার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে।

প্রযুক্তির চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের সংযোগ

এক শীর্ষ ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীর বক্তব্য তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে এআইভিত্তিক সার্ভিল্যান্স প্রযুক্তিগতভাবে চালু করা সম্ভব হলেও এটিকে পুরোপুরি কার্যকর ও নির্ভরযোগ্য করা চ্যালেঞ্জিং। শুধু সফটওয়্যার স্থাপন করলেই হবে না; তথ্যের সমন্বয়, কেওয়াইসি সংযোগ, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, সাইবার নিরাপত্তা, মডেল যাচাই এবং দক্ষ জনবল— সবকিছু একসঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে।

অর্থাৎ শেয়ারবাজারে এআইভিত্তিক নজরদারির সাফল্য শুধু প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করবে না। বাজারের তথ্য কতটা দ্রুত ও নির্ভুলভাবে এক জায়গায় আনা যাচ্ছে এবং এআই শনাক্ত করা সন্দেহজনক লেনদেনের বিরুদ্ধে কত দ্রুত ও যথাযথভাবে তদন্ত করা যাচ্ছে, সেটিই হবে এ উদ্যোগের কার্যকারিতার অন্যতম প্রধান বিষয়।

Facebook Comments Box

Posted ৬:০২ পিএম | রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

sharebazar24 |

মো. সাজিদ খান প্রধান সম্পাদক
মো. সিরাজুল ইসলাম সম্পাদক
বার্তা ও সম্পাদকীয় কার্যালয়

৬০/১, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০

হেল্প লাইনঃ 01742-768172

E-mail: sharebazar024@gmail.com