নিজস্ব প্রতিবেদক | মঙ্গলবার, ২৭ মে ২০২৫ | 230 বার পঠিত | প্রিন্ট
বহুদিন ধরে দুরবস্থায় থাকা ২০টি ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (এনবিএফআই) লাইসেন্স বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব প্রতিষ্ঠানে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে না পারা, অতিমাত্রায় খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি ও পরিচালনায় চরম দুর্বলতার অভিযোগে লাইসেন্স বাতিলের প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট ২০টি প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে ১৫ দিনের মধ্যে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে, কেন তাদের লাইসেন্স বাতিল করা হবে না।
চিঠিপ্রাপ্ত ২০টি এনবিএফআই হলো:
সিভিসি ফাইন্যান্স, বে লিজিং, ইসলামিক ফাইন্যান্স, মেরিডিয়ান ফাইন্যান্স, জিএসপি ফাইন্যান্স, হজ্জ ফাইন্যান্স, ন্যাশনাল ফাইন্যান্স, আইআইডিএফসি, প্রিমিয়ার লিজিং, প্রাইম ফাইন্যান্স, উত্তরা ফাইন্যান্স, আভিভা ফাইন্যান্স, ফিনিক্স ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং, ফার্স্ট ফাইন্যান্স, ইউনিয়ন ক্যাপিটাল, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, বিআইএফসি, ফারইস্ট ফাইন্যান্স ও এফএএস ফাইন্যান্স।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, চিঠির জবাবের ভিত্তিতে এসব প্রতিষ্ঠানের একীভূতকরণ বা অবসায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
চরম আর্থিক সংকটে প্রতিষ্ঠানগুলো
২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এসব ২০ প্রতিষ্ঠানে আমানতের পরিমাণ ছিল ২২,১২৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক আমানত ১৬,৩৬৭ কোটি ও ব্যক্তি আমানত ৫,৭৬০ কোটি টাকা। কিন্তু ঋণ খেলাপির হার দাঁড়িয়েছে ৮৩ শতাংশ, যার পরিমাণ ২১,৪৬২ কোটি টাকা। জামানত রয়েছে মাত্র ৬,৮৯৯ কোটি টাকার।
এছাড়া, প্রতিষ্ঠানগুলোর বার্ষিক ব্যয় ২০৬ কোটি টাকা, এর মধ্যে এমডিদের বেতন ১২ কোটি ও অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন ১৭২ কোটি টাকা। অথচ কার্যত কোনো সুদ আয় নেই বললেই চলে।
ব্যাংক খাতে আস্থাহীনতা বাড়ছে
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতার প্রভাব ভালো আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও পড়ছে। ফলে গোটা এনবিএফআই খাতে আস্থা সংকট দেখা দিয়েছে। বর্তমানে দেশে মোট ৩৫টি এনবিএফআই রয়েছে, যার মধ্যে বাকি ১৫টির গড় খেলাপি ঋণের হার ৮ শতাংশের নিচে, যা অনেক ব্যাংকের তুলনায় ভালো।
অভিযোগে জড়িত আলোচিত ব্যক্তিরা
তালিকাভুক্ত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে আলোচিত আর্থিক অপরাধী প্রশান্ত কুমার (পি কে) হালদারের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। তিনি একসময় এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি ব্যাংকের এমডি ছিলেন। তার মাধ্যমে কিছু প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার পর ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোতেও অস্থিতিশীলতা দেখা দেয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অবস্থান
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিস্থিতি যাতে আরও খারাপ না হয়, সে জন্য কঠোর নজরদারির আওতায় রাখা হয়েছে। প্রয়োজনে আইন অনুযায়ী পুনর্গঠন বা একীভূতকরণের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিক্রিয়া
ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের এমডি কাজী আলমগীর বলেন, “আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের চিঠি পেয়েছি। আলোচনার মাধ্যমে কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপন করব। গ্রাহকদের টাকা ফেরত দিতে ঋণ আদায়ে আমরা কাজ করছি।”
সার্বিক পরিস্থিতি:
এনবিএফআই মোট: ৩৫টি
সংকটে থাকা: ২০টি
খেলাপি ঋণ (ডিসেম্বর ২০২৩): ২৫,৮০৮ কোটি টাকা (৮৩%)
মোট ক্ষতি: ২৩,৪৪৮ কোটি টাকা
ব্যক্তি আমানতকারীর ঝুঁকিতে অর্থ: ৫,৭৬০ কোটি টাকা
বাংলাদেশ ব্যাংকের এ পদক্ষেপ সফল হলে এনবিএফআই খাতে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও অনিয়ম রোধে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

Posted ২:২৪ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ২৭ মে ২০২৫
sharebazar24 | sbazaradmin
.
.