শুক্রবার ২৩শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৯ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ব্রেকিং নিউজ >>
ব্রেকিং নিউজ >>

চলমান সংস্কারেই ব্যাংকিং খাত ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   রবিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৪ | 119 বার পঠিত | প্রিন্ট

চলমান সংস্কারেই ব্যাংকিং খাত ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা

জাল-জালিয়াতি আর লুটপাটে ফতুর করে দেয়ার পর জোরজবরদস্তি করে ব্যাংক একীভূতকরণের
ফর্মুলা এনেছিলেন পতিত সরকারের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার। ১০টি ব্যাংক একীভূত করার ঘোষণাও দেওয়া হয়। এ লক্ষ্যে চুক্তি হয় কয়েকটি ব্যাংকের মধ্যে। যদিও অনেক ব্যাংক এই পদক্ষেপকে ভালোভাবে নেয়নি।

সংবেদনশীল ও জটিল এই কাজটি করতে আর্ন্তজাতিকভাবে অনুসৃত মানদণ্ড ও রীতিনীতি এমনকি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজের ঘোষিত নীতিমালা না মেনে তড়িঘড়ি করা হচ্ছিল। স্বেচ্ছাচারীভাবে চাপিয়ে দেওয়া কয়েকটি ব্যাংক একীভূতকরণের ঘোষণা এবং এ প্রক্রিয়ায় থাকা ভালো ব্যাংকগুলোর অস্বস্তি, একীভূত হতে কোনো কোনো দুর্বল ব্যাংকের অনীহা, সব মিলিয়ে ব্যাংকিং খাতে ছিল শঙ্কা, অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা । যা একীভূতকরণের পুরো প্রক্রিয়াটিকে শুরুর আগেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রস্তাবিত একীভূতরকরণের মাধ্যমে খেলাপি ঋণে জর্জরিত দুর্বল ব্যাংকের মন্দ ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহিসংক্রান্ত বিষয়গুলোতে যে ধরনের অস্পষ্টতা তৈরি করা হয়েছিল, তা মূলত ছিল সংকটের মূল সমস্যাকে পাশ কাটিয়ে ঋণ খেলাপী ও জালিয়াতির জন্য দায়ী মহলকে “দায়মুক্তি” প্রদানের নামান্তর।

তবে পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে নতুন অন্তর্র্বতী সরকার ব্যাংক একীভূত করার বিষয়ে ভেবেচিন্তে ধীরে চলার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এরই অংশ হিসেবে আগের চুক্তিগুলো বাতিলের পক্ষে মত দিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন গর্ভনর। তবে, প্রয়োজন হলে কিছু ব্যাংক একীভূত করা লাগতে পারে। তবে সেটা ‘জবরদস্তিমূলক’ হবে না; বরং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বীকৃত ‘প্রম্প্ট কারেক্টিভ অ্যাকশন (পিসিএ) ফ্রেমওয়ার্ক অনুযায়ী নতুন করে একীভূতকরণ হবে। সেটাও শুরু হতে পারে আগামী বছরের জুন নাগাদ।

গত ৪ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ব্যাংকার্স সভায় জোরজবরদস্তি করে ব্যাংক একীভূতকরণের চুক্তি বাতিলের দাবি তোলেন ব্যাংক নির্বাহীরা। তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন গভর্নর আহসান এইচ মনসুর দাবি মেনে নিয়ে দ্রুততম সময়ে চুক্তি বাতিলের নির্দেশনা জারির আশ্বাস দেন। অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান সেলিম আর এফ হোসেন গণমাধ্যমকে বলেছেন , ‘আগের গভর্নরের চাপানো একীভূতকরণ চুক্তির বিষয়ে নতুন গভর্নর ‘না’ করেছেন। আগের চুক্তিগুলো এখন অচল।

এসব জবরদস্তির চুক্তি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালার সরাসরি লঙ্ঘন। সুতরাং তা বাস্তবায়নের সুযোগ নেই।’ একীভূতকরণের আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের বিধি লঙ্ঘন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে গত ১৪ মার্চ দুর্বল পদ্মা ব্যাংককে এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে একীভূতকরণের ঘোষণা দেওয়া হয়।

একই ধারাবাহিকতায় গত ৩ এপ্রিল দুর্বল বিডিবিএলকে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের সঙ্গে এবং রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংককে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংককের সঙ্গে একীভূতকরণের ঘোষণা করা হয়। আর ৮ এপ্রিল বেসিক ব্যাংককে সিটি ব্যাংকের সঙ্গে এবং ৯ এপ্রিল ন্যাশনাল ব্যাংককে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিসি) সঙ্গে একীভূতকরণের ঘোষণা দেওয়া হয়।

যদিও ব্যাংক একীভূতকরণে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড রয়েছে। তবে সাবেক গভর্নর কোনো কিছুর তোয়াক্কা করেননি। তিনি একীভূতকরণের চুক্তি করতে বাধ্য করেন বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা।

এই অবস্থায় ২ সেপ্টেম্বর বিডিবিএলের ৩২৪তম বোর্ড সভায় সোনালী ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত না হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সূত্র জানায়, একীভূতকরণে সিদ্ধান্ত বাতিল চেয়ে চিঠি দিয়েছে বেসিক ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংক। বর্তমান গভর্নর আগের একীভূতকরণ চুক্তি বাতিল করার পক্ষে মত দেওয়ায় খুব শিগগির এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত জানানো হবে।

এদিকে ব্যাংক খাত সংস্কারে সম্প্রতি ছয় সদস্যের টাস্কফোর্স গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এছাড়াও ব্যাংকিং খাতকে রুগ্ন দশা থেকে বের করে আনতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন নতুন গভর্নর। ফলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন , এসব উদ্যোগ চলমান থাকলে একীভূত না করেই দুর্বল ব্যাংকগুলোকে টেনে তোলা সম্ভব হতে পারে।

নব গঠিত টাস্কফোর্স আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষার্থে ব্যাংকিং খাতের বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতি, মন্দ সম্পদ এবং প্রধান প্রধান ঝুঁকি নিরূপণ, দুর্বল ব্যাংকগুলোর আর্থিক সূচক পর্যালোচনা, ঋণের প্রকৃত অবস্থা নিরূপণ, প্রভিশন ঘাটতি নিরূপণ, তারল্য পরিস্থিতি পর্যালোচনা, নীট মূলধন নির্ণয়, সম্পদের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের মন্দ সম্পদকে পৃথকীকরণ সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনা করবে।

এছাড়া টাস্কফোর্সের মাধ্যমে সংকটকালীন প্রতিঘাত সক্ষমতা অর্জনে ব্যাংকের সুশাসন এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণ প্রক্রিয়ার আওতায় রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্ক উন্নয়ন, ব্যাংকের সিদ্ধান্ত গ্রহণে রাজনৈতিক এবং করপোরেট প্রভাব সীমিতকরণ, ব্যাংকের মালিকানা সংস্কার ইত্যাদি সংক্রান্ত প্রস্তাবনা প্রদান, সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকের জন্য রিকভারি এবং রেজুলেশন ফ্রেমওয়ার্ক ও সংশ্লিষ্ট গাইডলাইন প্রস্তুতকরণ, দুর্বল ব্যাংকগুলোর জন্য বিভিন্ন নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

টাস্কফোর্স আর্থিক খাত সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন আইন যেমন ব্যাংক কোম্পানি আইন, বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার ইত্যাদি সংস্কার এবং অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি, ব্যাংক অধিগ্রহণ, একীভূতকরণ আইন প্রণয়ন, সংস্কার ও যুগোপযোগীকরণের প্রস্তাব প্রদান করবে এবং ব্যাংকিং খাতের শ্বেতপত্র প্রকাশের পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

এছাড়াও ব্যাংক খাত সংস্কারে বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ঋণ দিচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের আধুনিকায়ন এবং সক্ষমতা বাড়ানোর কাজেও এই ঋণ ব্যয় করা হবে। এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন একটি প্রকল্প হাতে নিচ্ছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকেও সহায়তার আশ্বাস মিলেছে। প্রাথমিকভাবে বিশ্বব্যাংক থেকে ৪০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণের বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ঋণের পরিমাণ বাড়িয়ে ৪৫ কোটি ডলার করা নিয়ে এখন আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পাশাপাশি এডিবি দেশের ব্যাংক খাত সংস্কারে ১৩০ কোটি ডলার ঋণ দেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে। এই ঋণ দুর্বল হয়ে পড়া ব্যাংকগুলোকে পুনর্মূলধন হিসেবে দেওয়া যায় কি না, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।

Facebook Comments Box

Posted ১০:৩৭ অপরাহ্ণ | রবিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৪

sharebazar24 |

এ বিভাগের আরও খবর

আর্কাইভ

রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি
 
১০
১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭৩০৩১
মো. সিরাজুল ইসলাম সম্পাদক
বার্তা ও সম্পাদকীয় কার্যালয়

৬০/১, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০

হেল্প লাইনঃ 01742-768172

E-mail: sharebazar024@gmail.com