ব্রেকিং >>
ব্রেকিং >>

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির ঋণ আদায় নিয়ে অনিশ্চয়তা

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬ | 23 বার পঠিত | প্রিন্ট

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির ঋণ আদায় নিয়ে অনিশ্চয়তা
Responsive Ad Banner

নিজস্ব প্রতিবেদক: শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত একটি কোম্পানিকে  বিপুল পরিমাণ ঋণ দিয়ে আর্থিক ঝুঁকিতে পড়েছে চারটি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক। কোম্পানিটি হলো কেয়া কসমেটিকস লিমিটেড।  অনারোপিত সুদসহ কেয়া গ্রুপের কাছে ব্যাংকগুলোর মোট পাওনার পরিমাণ তিন হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ঋণদাতা ব্যাংক চারটি হলো—সাউথইস্ট ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক ও স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক।

সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোর কাছে বন্ধক রাখা সম্পত্তির বর্তমান বাজারমূল্য পাওনার তুলনায় অনেক কম। সাউথইস্ট ব্যাংকের কাছে প্রায় ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা ঋণের বিপরীতে বন্ধকি সম্পত্তির বাজারমূল্য মাত্র পৌনে ৩০০ কোটি টাকা। ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রায় সাড়ে ৭০০ কোটি টাকা ঋণের বিপরীতে বন্ধকি সম্পত্তির মূল্য ২০০ কোটি টাকারও কম। পূবালী ব্যাংকের ক্ষেত্রে সোয়া ৫০০ কোটি টাকা ঋণের বিপরীতে সম্পত্তির মূল্য প্রায় ১৫০ কোটি টাকা। এ ছাড়া স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক থেকেও কেয়া গ্রুপ প্রায় ১০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে।

Responsive Ad Banner

ব্যাংকগুলোর আশঙ্কা, ঋণের বিপুল অর্থ আদায় করা সম্ভব না হলে ভবিষ্যতে তাদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, কেয়া কসমেটিকসের নেওয়া ঋণের বিপরীতে বন্ধক রাখা সম্পত্তির মোট বাজারমূল্য ঋণের ৩০ শতাংশেরও অনেক নিচে। এ অবস্থায় ঋণ পরিশোধ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

সূত্রগুলোর দাবি, ঋণ পরিশোধের দায় এড়াতে কেয়া গ্রুপের চেয়ারম্যান আবদুল খালেক পাঠান নানা ধরনের টালবাহানা করছেন। গ্রুপটির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে, ঋণদাতা ব্যাংকগুলো তাদের রপ্তানি আয় নির্ধারিত বৈদেশিক মুদ্রা বা এফসি হিসাবে জমা করেনি। তবে ব্যাংকগুলোর বক্তব্য, এ অভিযোগের পক্ষে কেয়া গ্রুপ সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি।

এ পরিস্থিতিকে সংশ্লিষ্টরা দেশের আলোচিত হলমার্ক কেলেঙ্কারির ঘটনার সঙ্গে তুলনা করছেন।

ব্যাংকগুলোর নথিপত্র পর্যালোচনায় ঋণের দায় এড়ানো এবং আইনি জটিলতা থেকে রেহাই পাওয়ার উদ্দেশ্যে কেয়া গ্রুপের পক্ষ থেকে বিভিন্ন অভিযোগ তোলার বিষয়টি উঠে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে একের পর এক চিঠি পাঠিয়ে রপ্তানি আয় জমা না দেওয়ার অভিযোগ করা হলেও এর সমর্থনে প্রয়োজনীয় প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ব্যাংকের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, কেয়া গ্রুপের চেয়ারম্যানের অভিযোগ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তাঁদের দাবি, ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণখেলাপি হওয়ার সুযোগ তৈরির লক্ষ্যেই এ ধরনের অভিযোগ সামনে আনা হচ্ছে।

ইতোমধ্যে একটি ব্যাংক কেয়া কসমেটিকসকে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করে চিঠি দিয়েছে। একই সঙ্গে পাওনা অর্থ আদায়ের জন্য ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে অর্থঋণ আদালতে মামলা এবং ফৌজদারি কার্যবিধির আওতায় সিআর মামলা করা হয়েছে। এসব মামলা বর্তমানে চলমান রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

কেয়া গ্রুপের বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়মের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংক তদন্ত শুরু করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিস্তারিত তদন্ত শেষে প্রতিবেদনটি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পাঠানো হয়। বর্তমানে দুদকের একজন উপপরিচালক বিষয়টি নিয়ে নিবিড় তদন্ত করছেন বলে দুদক সূত্রে জানা গেছে।

দুদক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে কেয়া গ্রুপের রপ্তানি আয় আত্মসাৎ করা হয়েছে কিংবা ব্যাংকগুলো ওই আয় নির্ধারিত হিসাবে জমা দেয়নি—এমন অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদনে কেয়া কসমেটিকস ও প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান আবদুল খালেক পাঠানকে দায়ী করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, চেয়ারম্যান সুকৌশলে অর্জিত রপ্তানি আয় অন্যত্র স্থানান্তর বা পাচার করেছেন। এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে অর্থ পাচার বা মানি লন্ডারিংয়ের গুরুতর বিষয় জড়িত থাকার কথাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

দুদক ও ব্যাংক সূত্র থেকে পাওয়া বিস্তারিত তথ্য অনুযায়ী, সাউথইস্ট ব্যাংকের গুলশান শাখা, পূবালী ব্যাংকের প্রিন্সিপাল শাখা, ন্যাশনাল ব্যাংকের গুলশান শাখা এবং স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের গুলশান শাখার মাধ্যমে কেয়া গ্রুপের রপ্তানি আয় যথাযথভাবে দেশে প্রত্যাবাসিত হয়েছিল।

সূত্রগুলোর তথ্য বলছে, এসব রপ্তানি আয় থেকে আমদানি মূল্য পরিশোধের দায়, বিভিন্ন ব্যাংকিং চার্জ, উৎসে কর, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) এবং অগ্রিম আয়কর (এআইটি) পরিশোধ করা হয়। এরপর অবশিষ্ট অর্থ প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী গ্রাহকের হিসাবে সমন্বয় করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি পরিদর্শনে দেখা গেছে, ২০০৪ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সাউথইস্ট ব্যাংকের গুলশান শাখার মাধ্যমে প্রায় ৮ হাজার ৪৩৩ কোটি টাকার রপ্তানি আয় এসেছে। এর বড় অংশ আমদানি মূল্য পরিশোধ ও সুদ বাবদ ব্যয় হয়েছে। পরবর্তী সময়ে অবশিষ্ট অর্থ গ্রাহকের চলতি হিসাবে স্থানান্তর করা হয়েছে।

একইভাবে পূবালী ব্যাংকের প্রিন্সিপাল শাখার মাধ্যমে প্রায় ৭২২ কোটি টাকার রপ্তানি আয় এসেছে। ন্যাশনাল ব্যাংকের গুলশান শাখার মাধ্যমে এসেছে ২৭০ লাখ মার্কিন ডলার এবং স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের মাধ্যমে এসেছে ৬০ কোটি টাকার বেশি রপ্তানি আয়।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, এসব অর্থ থেকে বিভিন্ন ঋণ ও ঋণপত্রের (এলসি) দায় সমন্বয়ের পর অবশিষ্ট টাকা কেয়া গ্রুপের হিসাবে জমা দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের চূড়ান্ত তদন্ত ও পর্যালোচনায় কেয়া কসমেটিকস গ্রুপের পক্ষ থেকে ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে রপ্তানি আয় নির্ধারিত বৈদেশিক মুদ্রার হিসাবে জমা না দেওয়ার যে অভিযোগ তোলা হয়েছে, তার সত্যতা পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

তদন্তের তথ্য অনুযায়ী, রপ্তানি আয় দেশে আসার পর নিয়ম অনুযায়ী আমদানি মূল্য, ব্যাংকিং চার্জ, কর এবং ঋণ ও ঋণপত্রের দায় সমন্বয় করা হয়েছে। এরপর অবশিষ্ট অর্থ গ্রাহকের হিসাবে জমা দেওয়ার বিষয়টিও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

এদিকে কেয়া গ্রুপের কাছে চার ব্যাংকের পাওনা তিন হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ায় ঋণ আদায় নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ঋণের বিপরীতে বন্ধকি সম্পত্তির বাজারমূল্য তুলনামূলক কম হওয়ায় অর্থ আদায় সম্ভব না হলে ব্যাংকগুলোর দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে, রপ্তানি আয় নিয়ে অভিযোগের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদন এবং বর্তমানে দুদকের চলমান অনুসন্ধান এ ঘটনার পরবর্তী অগ্রগতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

Facebook Comments Box

Posted ১১:৫৮ পিএম | সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

sharebazar24 |

এ বিভাগের আরও খবর

মো. সাজিদ খান প্রধান সম্পাদক
মো. সিরাজুল ইসলাম সম্পাদক
বার্তা ও সম্পাদকীয় কার্যালয়

৬০/১, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০

হেল্প লাইনঃ 01742-768172

E-mail: sharebazar024@gmail.com