নিজস্ব প্রতিবেদক | রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬ | 60 বার পঠিত | প্রিন্ট
নিজস্ব প্রতিবেদক: ব্যাংক খাতের পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় বড় পরিবর্তন এনে জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে ‘ব্যাংক রেজুলেশন বিল, ২০২৬’। নতুন এই আইনের ফলে একীভূত পাঁচটি ব্যাংকের মালিকানায় আগের শেয়ারহোল্ডারদের ফেরার সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে পূর্বে এসব ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে থাকা এস আলম গ্রুপ ও নাসা গ্রুপের মতো বিতর্কিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলোর জন্যও পথ উন্মুক্ত হয়েছে।
এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ‘ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ’-এ ব্যাংক ধসের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের অর্থ ফেরত দিলেও মালিকানায় ফেরার সুযোগ ছিল না। তবে নতুন আইনে সেই বিধান সংশোধন করা হয়েছে।
আইনের ১৮(ক) ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে, কোনো তফসিলি ব্যাংক রেজুলেশন প্রক্রিয়ায় গেলে পূর্বের শেয়ারহোল্ডার কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংকের বিবেচনায় উপযুক্ত ব্যক্তি বা গোষ্ঠী পুনরায় ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ ও দায় গ্রহণের জন্য আবেদন করতে পারবে। এ ক্ষেত্রে আবেদনকারীদের একটি বিস্তারিত অঙ্গীকারনামা জমা দিতে হবে, যেখানে সরকারের দেওয়া আর্থিক সহায়তা ফেরত দেওয়া, নতুন মূলধন সংযোজন, মূলধন ঘাটতি পূরণ, আমানতকারী ও পাওনাদারের দায় পরিশোধ এবং করসহ অন্যান্য আর্থিক দায় নিষ্পত্তির পরিকল্পনা থাকতে হবে। পাশাপাশি সুশাসন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা জোরদারের বিষয়টিও উল্লেখ করতে হবে।
আইনে আরও বলা হয়েছে, আবেদন যাচাই-বাছাই শেষে বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারের অনুমোদন নেবে। অনুমোদন পাওয়ার পর আগের মালিকদের ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে সরকারের বিনিয়োগকৃত অর্থের অন্তত ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ তাৎক্ষণিকভাবে পরিশোধ করতে হবে। বাকি ৯২ দশমিক ৫০ শতাংশ দুই বছরের মধ্যে ১০ শতাংশ সরল সুদসহ পরিশোধ করতে হবে।
এছাড়া পুনর্গঠিত ব্যাংকের কার্যক্রম বাংলাদেশ ব্যাংক দুই বছর তদারকি করবে। এই সময় শেষে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে শর্ত পূরণের অগ্রগতি মূল্যায়ন করা হবে। কোনো শর্ত পূরণে ব্যর্থতা দেখা গেলে অনুমোদন বাতিলের সুপারিশ করা হতে পারে।
তবে নতুন এই বিধান নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। তাদের মতে, কঠোর যাচাই ছাড়া কেবল অঙ্গীকারনামার ভিত্তিতে মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়া হলে তা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে এবং এতে আমানতকারীদের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, এই বিধান ব্যাংক খাতের অনিয়মে জড়িতদের জন্য এক ধরনের পুরস্কারের মতো। তিনি বলেন, যেসব গোষ্ঠী অনিয়মের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে দুর্বল করেছে, তাদেরই আবার ফিরিয়ে আনা জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে নেতিবাচক বার্তা দেবে।
তিনি আরও আশঙ্কা প্রকাশ করেন, যদি অর্থের উৎস যাচাই না করা হয়, তবে সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলো অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে পুনরায় নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে, যা পুরো সংস্কার প্রক্রিয়াকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে।
সংসদে বিলটির বিরোধিতা করে বিরোধীদলীয় সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, এই আইন আমানতকারীদের সুরক্ষা দুর্বল করতে পারে। তার মতে, অতীতে রাষ্ট্রীয় অর্থ দিয়ে ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখা হলেও সাধারণ আমানতকারীদের স্বার্থ যথাযথ গুরুত্ব পায়নি।
তিনি আরও বলেন, আগে ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হলে শেয়ারহোল্ডারদের আগে ক্ষতি বহন করতে হতো, কিন্তু নতুন কাঠামোয় সেই ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা ব্যাংকিং খাতে আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সরকার আমানতকারীদের সুরক্ষায় অঙ্গীকারবদ্ধ। তবে বর্তমান বাস্তবতায় বাজারভিত্তিক সমাধানের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখা প্রয়োজন। তিনি জানান, ইতোমধ্যে ব্যাংক খাতে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ ব্যয় হয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও অর্থের প্রয়োজন হতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়।
তিনি আরও বলেন, এই আইনের উদ্দেশ্য কোনো অনিয়মকারী গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়া নয়; বরং ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা, স্থিতিশীলতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের মে মাসে জারি করা ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশের আওতায় এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়। এই ব্যাংকের জন্য মোট ৩৫ হাজার কোটি টাকার মূলধনের মধ্যে সরকার দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা এবং আমানতকারীদের জন্য ১৫ হাজার কোটি টাকার শেয়ার সংরক্ষণ করা হয়েছে।
এছাড়া আমানত বীমা তহবিল থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করে ক্ষুদ্র আমানতকারীদের সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত দেওয়া হচ্ছে। পুরো প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি নির্দিষ্ট স্কিমও ঘোষণা করেছে।
এর আগে বিভিন্ন ব্যাংকে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে, যেখানে এস আলম গ্রুপসহ কয়েকটি বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততার বিষয়টি বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসে। এসব ঘটনার ফলে দেশের ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি হয়।
Posted ৬:৫৬ অপরাহ্ণ | রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬
sharebazar24 | sajed khan
.
.