বৃহস্পতিবার ১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১লা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ব্রেকিং নিউজ >>
ব্রেকিং নিউজ >>

ব্যাংকখাতের বড় সংকট: একীভূত না হলে টিকে থাকা কঠিন পাঁচ ব্যাংকের

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   শনিবার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | 191 বার পঠিত | প্রিন্ট

ব্যাংকখাতের বড় সংকট: একীভূত না হলে টিকে থাকা কঠিন পাঁচ ব্যাংকের

বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে গভীর সংকট তৈরি করেছে পাঁচ বেসরকারি ব্যাংক— এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক। গ্রাহকরা দীর্ঘদিন ধরে তাদের আমানত ফেরত পাচ্ছেন না, এমনকি কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও মাসের শেষে বেতন তুলতে পারছেন না। এতে ব্যাংকের ভেতরে-বাইরে আতঙ্ক ও হতাশা ছড়িয়ে পড়েছে।

শাখাগুলোতে নীরবতা, লেনদেন প্রায় বন্ধ
রাজধানীর মতিঝিল, নয়াপল্টন এবং সাতক্ষীরা জেলার বিভিন্ন শাখায় সরেজমিন দেখা গেছে—গ্রাহকের উপস্থিতি থাকলেও লেনদেন কার্যত বন্ধ। প্রতিদিন গড়ে ২০-৩০ জন গ্রাহক টাকা তুলতে ব্যাংকে গেলেও কাউকেই পূর্ণ অর্থ ফেরত দেওয়া হচ্ছে না। কর্মকর্তারা গ্রাহকদের অনুরোধ, কান্নাকাটি শুনেও অসহায় অবস্থায় বসে আছেন।

একজন গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক কর্মকর্তা জানান, “মার্জারের আগে বাংলাদেশ ব্যাংক তারল্য সহায়তা বন্ধ রেখেছে। ফলে এক মাস ধরে কাউকে কোনো টাকা দিতে পারিনি। আমাদের নিজেদের বেতনও আমরা তুলতে পারছি না।”

জরুরি প্রয়োজনেও মিলছে না টাকা
গ্রাহক ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের নয়াপল্টন শাখায় এক গ্রাহক বাবার বিদেশে চিকিৎসার জন্য টাকা তুলতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছেন। আরেক গ্রাহকের হৃদরোগের অপারেশনের জন্য ১১ লাখ টাকা প্রয়োজন হলেও ব্যাংক মাত্র দুই লাখ টাকা দিয়েছে।

ইউনিয়ন ব্যাংকের এমডি মো. হুমায়ুন কবির জানান, “আমরা প্রতিষ্ঠানের এফডিআরের টাকা ফেরত দিতে পারছি না। এমনকি ছোট ছোট আমানতকারীর টাকাও দেওয়া সম্ভব নয়।”

সীমিত উত্তোলন, হতাশ গ্রাহক
সাতক্ষীরার এক গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে তিন লাখ ২৩ হাজার টাকা থাকলেও তাকে জানানো হয়েছে সপ্তাহে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা তোলা যাবে।
একজন স্কুলশিক্ষক ১৮ বার শাখায় ঘুরেও নিজের জমা এক লাখ ২৭ হাজার টাকার এক হাজার টাকাও তুলতে ব্যর্থ হয়েছেন।

সাদ্দাম হোসেন নামে আরেক গ্রাহক বলেন, “সংসার চালাতে ধার করতে হচ্ছে। অথচ নিজের টাকাই ব্যাংক থেকে তুলতে পারছি না।”

কর্মকর্তারাও ভুক্তভোগী
শুধু গ্রাহক নন, ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও বেতনের টাকা তুলতে পারছেন না। এক কর্মকর্তা বলেন, “৮০ হাজার টাকা বেতন এলেও আমি এক হাজার টাকা পর্যন্ত তুলতে পারি না। সংসার চালাতে বন্ধুদের কাছে ধার চাইতে হচ্ছে।”

বাংলাদেশ ব্যাংকের পদক্ষেপ
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংক দুর্বল ব্যাংকগুলো বাঁচাতে ৫২ হাজার কোটি টাকা সহায়তা দেয়। তবে এখন সংকট আবার তীব্র হয়েছে।

তথ্যমতে— পাঁচ ব্যাংকের মোট আমানত ১ লাখ ৪৭ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা, বিতরণকৃত ঋণ ১ লাখ ৯০ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকা। খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪৬ হাজার ৯১৮ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৭৭ শতাংশ। মূলধন ঘাটতি ৪৫ হাজার ২০৩ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংক গ্রাহকের আমানতের শতভাগ সুরক্ষার আশ্বাস দিয়েছে। নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, “শিগগির একীভূতকরণ কার্যকর হবে। পাঁচ ব্যাংক মিলে একটি শক্তিশালী ব্যাংক গঠন করা হবে। সরকার সহায়তা দেবে এবং পরবর্তীতে লাভসহ ফেরত নেবে।”

মার্জারের অপেক্ষায় পাঁচ ব্যাংক
বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ইউনিয়ন, গ্লোবাল ইসলামী ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে এক্সিম ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক রাজি না হওয়ায় প্রক্রিয়া আটকে আছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দ্রুত মার্জার ছাড়া সংকট উত্তরণের বিকল্প নেই।

গবেষক এম হেলাল আহমেদ জনি বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংকের তারল্য সহায়তা আর কার্যকর হবে না। সংকট নিরসনে অবিলম্বে মার্জার করতে হবে।”

৯২ লাখ গ্রাহক ও ১৫ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। চিকিৎসা, শিক্ষা ও সংসার খরচের জন্য নিজের টাকাই ব্যবহার করতে না পারা গ্রাহকরা হতাশ। অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘদিনের অনিয়ম, লুটপাট ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার ফলেই এই সংকট। একমাত্র সমাধান হলো দ্রুত একীভূতকরণ, যা গ্রাহকের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে।

 

Facebook Comments Box

Posted ৫:৫৬ অপরাহ্ণ | শনিবার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫

sharebazar24 |

এ বিভাগের আরও খবর

আর্কাইভ

রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি
 
১০
১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭৩০৩১
মো. সিরাজুল ইসলাম সম্পাদক
বার্তা ও সম্পাদকীয় কার্যালয়

৬০/১, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০

হেল্প লাইনঃ 01742-768172

E-mail: sharebazar024@gmail.com