নিজস্ব প্রতিবেদক | সোমবার, ২৮ জুলাই ২০২৫ | 223 বার পঠিত | প্রিন্ট
একীভূতকরণ ও অবসায়নের আশঙ্কায় দেশের ব্যাংক খাতে আমানতকারীদের আস্থায় চিড় ধরেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, গ্রাহকরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে রাখছেন হাতে। ফলে চলতি বছরের মে মাস শেষে ব্যাংক খাতে আমানত প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৮ দশমিক ৭৪ শতাংশে, যা গত মার্চে ছিল ৯ দশমিক ৫১ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মে মাস শেষে ব্যাংকিং খাতে মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২০ লাখ ১৮ হাজার ১৯৬ কোটি টাকা। মার্চ পর্যন্ত আমানত কমার তালিকায় ছিল ১১টি ব্যাংক, কিন্তু মে মাসে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৬টিতে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গত ৫ আগস্ট সরকারের পরিবর্তনের পর কিছু ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক দুরবস্থা প্রকাশ পায়। এরপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তারল্য সহায়তা পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল করলেও, মে মাসে ‘ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ’ জারির পর আবারো উদ্বেগ সৃষ্টি হয় একীভূতকরণ নিয়ে। ফলে আমানত প্রত্যাহারের প্রবণতা বাড়ে।
বিশেষ করে এক্সিম, সোস্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী ও ইউনিয়ন ব্যাংকের একীভূতকরণের আলোচনা, এবং সম্ভাব্য আর্থিক ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তোলে। অন্যান্য কিছু ব্যাংকেও একই ধরনের চাপ দেখা দিয়েছে।
ঈদুল আজহার মৌসুমে সাধারণত নগদ টাকার প্রবাহ বাড়ে, কিন্তু এবার তা অতীতের সব রেকর্ড ভেঙেছে। গত ৫ জুন প্রচলনে থাকা নগদ টাকার পরিমাণ দাঁড়ায় ৩ লাখ ৩৯ হাজার ১৭৯ কোটি টাকা, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। গত বছরের ঈদুল আজহার আগে এই অঙ্ক ছিল ৩ লাখ ২৫ হাজার ৫৮৩ কোটি টাকা।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “একীভূতকরণ বা অবসায়নের সিদ্ধান্ত যদি দ্রুত ও স্পষ্টভাবে না আসে, তবে সাধারণ মানুষ আস্থা হারায়। এর ফলে পুরো ব্যাংকিং খাতেই অস্থিরতা তৈরি হয়।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মে মাস শেষে ব্যাংকিং খাতে ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৭ লাখ ১৯ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা। এর ফলে ঋণ-আমানত অনুপাত (এডিআর) দাঁড়িয়েছে ৮১ দশমিক ০২ শতাংশে। তবে কিছু দুর্বল ব্যাংকে এ অনুপাত অনেক বেশি।
যেসব ব্যাংকের আমানত সবচেয়ে বেশি কমেছে, তার মধ্যে রয়েছে: বেসিক ব্যাংক, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, মধুমতি ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও কমিউনিটি ব্যাংক। এছাড়া বিদেশি মালিকানাধীন আলফালাহ, স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া, উরি, হাবিব ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের আমানতেও হ্রাস দেখা গেছে। তবে এগুলো মূলত এলসি ও কমিশনভিত্তিক ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় আমানত প্রবণতা তুলনামূলকভাবে কম বলে জানান বিশ্লেষকরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় অতীতে করা দুর্নীতি, বড় ঋণ খেলাপি এবং ব্যাংকগুলোর দুর্বল পরিচালনা মিলিয়ে পুরো খাতেই তৈরি হয়েছে আস্থার সংকট। পরিস্থিতি সামাল দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতোমধ্যে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ ঋণ দিয়েছে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোকে।
একীভূতকরণের প্রস্তাবিত পাঁচটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে, যা তাদের মোট ঋণের প্রায় ৭৭ শতাংশ। এই উচ্চমাত্রার ঝুঁকির কারণেই ব্যাংকিং খাতে আমানতকারীদের আস্থাহীনতা বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
Posted ৭:৩৪ অপরাহ্ণ | সোমবার, ২৮ জুলাই ২০২৫
sharebazar24 | sbazaradmin
.
.