বৃহস্পতিবার ২৯শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৫ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

পর্ষদ ভাঙছে এক ডজন ব্যাংকের, আসছেন কারা

বিশেষ প্রতিবেদক:   |   বুধবার, ২১ আগস্ট ২০২৪ | 141 বার পঠিত | প্রিন্ট

পর্ষদ ভাঙছে এক ডজন ব্যাংকের, আসছেন কারা

অনিয়ম, দুর্নীতি, জালিয়াতিতে নাজুক অন্তত এক ডজন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিতে পারে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব পর্ষদ ভেঙে দিতে ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংকিং নীতি ও প্রবিধি বিভাগ। দাপ্তরিক কার্যক্রম শেষ হলেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। গভর্নরের দায়িত্ব নেয়ার পরেই তিনি বলেছেন, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে হবে। প্রয়োজনে এস আলমের মালিকানাধীনসহ দুর্বল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিতে হবে। এ জন্য নির্ধারিত সময় ফ্রেম বলা কঠিন।

তবে ব্যাংকের নিয়ম ভেঙে কিছু করার সুযোগ আর কেউ পাবেন না। গতকাল সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়েও এই আভাস দিয়েছেন তিনি। দুর্বল ব্যাংকসমূহের পর্ষদ ভেঙে দেয়ার বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকের বিবেচনায় রয়েছে বলে জানান গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। এর পরপরই গতকাল বিকেলে ন্যাশনাল ব্যাংকের পর্ষদ বাতিলের সিদ্ধান্ত আসে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে।

এরইমধ্যে পদত্যাগ করেন সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান জিয়াউল হাসান সিদ্দিকী। নিয়োগ বাতিল করা হয় গ্রামীণ ব্যাংকের চেয়ারম্যান এ কে এম সাইফুল মজিদ এবং পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের চেয়ারম্যান আকরাম আল হোসেন ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ মো. জামিনুর রহমানের।

ইসলামি ব্যাংক পিএলসি ও সোশ্যাল ইসলামি ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে দিতেও ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে চিঠি দেয়া হয়েছে। সূত্র বলছে, এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণাধীন যে সাতটি ব্যাংককে এত দিন অনৈতিক সুবিধা দিয়ে রক্ষা করা হচ্ছিল, এখন সেগুলোসহ মোট ১২টি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয়ার পরামর্শ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক।

এস আলম গ্রুপের বাইরে পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়া হতে পারে—এমন তালিকায় রয়েছে আইএফআইসি ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল (ইউসিবি) ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংকসহ আরো অন্তত কয়েকটি।

তবে এসব ব্যাংকের পর্ষদ বাতিল করা হলেও পরিচালনার দায়িত্বে কারা আসছেন তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েই গেছে। একইসঙ্গে এসব ব্যাংকে পুরো পর্ষদ ভেঙে দিয়ে নতুন পর্ষদ গঠন করা হবে, নাকি আগে যারা পর্ষদে ছিলেন তাদের মধ্য থেকে কাউকে কাউকে আনা হবে সেসব বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারে নি বাংলাদেশ ব্যাংক।

তবে গতকাল ন্যাশনাল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে নতুন পর্ষদ অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পর্ষদ ভেঙে দিয়ে গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের সই করা আদেশে বলা হয়েছে, ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেডের পরিচালনা পর্ষদের নীতি নির্ধারণী দুর্বলতার কারণে ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার অবনতি, ব্যাংকিং সুশাসন ও শৃঙ্খলা বিঘ্ন করার মাধ্যমে ব্যাংক-কোম্পানি এবং আমানতকারীদের স্বার্থের পরিপন্থি কর্মকাণ্ডে পর্ষদ সম্পৃক্ত থাকায় ব্যাংক- কোম্পানি আইন, ১৯৯১ (২০২৩ পর্যন্ত সংশোধিত) এর ৪৭ (১) এবং ৪৮(১) ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা ও জনস্বার্থে ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেডের বিদ্যমান পরিচালনা পর্ষদ বাতিলের আদেশ প্রদান করা হলো।

এদিকে আরেকটি আদেশে ব্যাংকটির নতুন পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে পরিচালক হিসেবে নিয়োগ
দেওয়া হয়েছে ব্যবসায়ী আবদুল আউয়াল মিন্টু, ব্যাংকটির উদ্যোক্তা শেয়ার হোল্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন এবং শেয়ার হোল্ডার জাকারিয়া তাহেরকে। এছাড়াও স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক মো. জুলকার নায়েন, সীমান্ত ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুখলেসুর রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ’র অধ্যাপক ড. মেলিতা মেহজাবিন এবং চার্টার্ড একাউন্টেন্ট মো. আব্দুস সাত্তার সরকার।

এদিকে আগামী সপ্তাহের মধ্যে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির পর্ষদ ভেঙে দেয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সূত্র বলছে, সেখানে একজন প্রশাসক বসানোর কথা ভাবা হচ্ছে। আর দ্বিতীয় বিকল্প হিসেবে পুরো পর্ষদ ভেঙে দিয়ে নতুন পর্ষদ গঠন করা হতে পারে। সেখানে ২০১৭ সালের আগে যাঁরা পর্ষদে ছিলেন, তাঁদের মধ্য থেকে কাউকে কাউকে আনা হবে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে এস আলমের শেয়ার স্থানান্তর জটিলতার কারণে খুব সতর্কতার সঙ্গে এগোতে হচ্ছে।

এস আলম গ্রুপের হাত থেকে ইসলামী ব্যাংককে রক্ষা করতে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার দাবি জানিয়ে গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে চিঠি দেয় ব্যাংকটির সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। গভর্নর বরাবর পাঠানো চিঠিতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পক্ষে সই করেছেন ইসলামী ব্যাংকের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট এ এস এম রেজাউল করিম।

চিঠিতে বলা হয়, বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেশের সর্ববৃহৎ ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের বোর্ড অব ডাইরেক্টরস ও কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে ব্যাংকের তহবিল লুটপাটের কিছু চিত্র প্রকাশিত হয়েছে। বাস্তব চিত্র আরও ভয়াবহ। দীর্ঘদিন এই লুটপাটের ধারা অব্যাহত থাকার কারণে ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে এবং ব্যাংকটির প্রতি গণমানুষের আস্থার সংকট দেখা দিয়েছে। ইসলামী ব্যাংকের স্বার্থ রক্ষা, গ্রাহকের আস্থা ফেরানো এবং ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম পুনরায় চালু করার লক্ষ্যে বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে দুর্নীতিমুক্ত, ইসলামী ব্যাংকের প্রতি সহানুভূতিশীল ব্যক্তি অথবা সাবেক পরিচালকদের মধ্য থেকে কিছুসংখ্যক ব্যক্তির সমন্বয়ে বোর্ড পুনর্গঠন জরুরি হয়ে পড়েছে।

মালিকানা বদলের শিকার হওয়া সোশ্যাল ইসলামি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয়ারও দাবি জানিয়েছেন ব্যাংকের কয়েকজন উদ্যোক্তা ও শেয়ারধারী। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পাঠানো এক চিঠিতে তাঁরা অভিযোগ করেছেন, ২০১৭ সালে একটি গোয়েন্দা সংস্থা অস্ত্রের মুখে ব্যাংকের তৎকালীন নেতৃত্বকে পদত্যাগে বাধ্য করে। বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ শুধু টাকা পাচার, ব্যাংক লুটপাট ও তাদের নির্দিষ্ট অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে ব্যাংকটি দখল করেছে। গ্রাহকের স্বার্থ ও টাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তাদের লক্ষ্য নয়।

এই চিঠিতে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক নতুন করে যে ১৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে, তার সিংহভাগ নামে–বেনামে তুলে নিয়েছে এস আলম গ্রুপ ও তাদের সহযোগীরা। সীমাহীন দুর্নীতির কারণে ব্যাংকটি দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। ফলে বর্তমানে গ্রাহক পর্যায়ে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে, অনেকে টাকা তুলে নিচ্ছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে সম্প্রতি চিঠিটি পাঠান সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের তিনজন উদ্যোক্তা। তাঁরা হলেন সাবেক চেয়ারম্যান মেজর রেজাউল হক (অব.), নির্বাহী কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান মো. আনিসুল হক এবং নিরীক্ষা কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান মো. আঙ্গুর রহমান।
২০১৭ সালে ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নেয় এস আলম গ্রুপ। এখন ব্যাংকটির চেয়ারম্যান গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলমের জামাতা বেলাল আহমেদ। তবে ব্যাংকটি দখলের পর চেয়ারম্যান করা হয়েছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আনোয়ারুল আজিম আরিফকে।

বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো চিঠিতে উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, এস আলম গ্রুপের সীমাহীন দুর্নীতি ও নামে-বেনামে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ দেওয়ায় ব্যাংকটি অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। ফলে ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৯ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেলেও বিশেষ ব্যবস্থায় ব্যাংকের টাকা এস আলম গ্রুপ ও তার বিভিন্ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান নামে ও বেনামে উত্তোলন অব্যাহত রেখেছে, যা দ্রুত বন্ধ করা দরকার। না হলে গ্রাহকের টাকা ফেরত পাওয়া নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা দেখা দেবে।

ওই চিঠিতে আরও বলা হয়, ব্যাংকের গ্রাহকের আমানত বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে টাকা ধার করে পরিশোধ করার প্রক্রিয়া চলমান থাকায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে পরিচালিত চলতি হিসাবে ঘাটতি দিন দিন বাড়ছে। এ ছাড়া পটিয়ার লোকজনকে একচেটিয়া নিয়োগ দেওয়ায় ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

ব্যাংকটিতে স্থিতিশীলতা ফেরাতে পরিচালনা পর্ষদ দ্রুত ভেঙে দেওয়ার পাশাপাশি ‘এস আলমের আজ্ঞাবহ এমডি, ডিএমডিসহ সব দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাকে অপসারণ’ করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, এস আলমের ব্যাংকগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ চলতি হিসাব ঘাটতি রয়েছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের। এই ব্যাংকের চেয়ারম্যান এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম (এস আলম)। তার স্ত্রী ফারজানা পারভীনসহ চার আত্মীয় এই ব্যাংকের পরিচালনা বোর্ডে রয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকটির ঘাটতি রয়েছে ছয় হাজার ৬৯৩ কোটি টাকা।
সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান এস আলমের জামাতা বেলাল আহমেদ। এই ব্যাংকের চলতি হিসাবের ঘাটতি রয়েছে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দুই হাজার ৮৭৭ কোটি টাকা।

দুই হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা ঘাটতি নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ন্যাশনাল ব্যাংক। এই ব্যাংকের বোর্ড সদস্য রত্না দত্ত এস আলম গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক সুব্রত কুমার ভৌমিকের স্ত্রী। চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে ইউনিয়ন ব্যাংক। তাদের ঘাটতি দুই হাজার ৯৭ কোটি টাকা। এস আলমের বোন হালিমা বেগম, ভাই ওসমান গনি ও মো. রাশেদুল আলম, রাশেদুলের স্ত্রী মার্জিনা শারমিন ও ভাগ্নে মোহাম্মদ মোস্তান বিল্লাহ আদিল ইউনিয়ন ব্যাংকের পরিচালনা বোর্ডে রয়েছেন।বছরের পর বছর ধরে দুর্বল আর্থিক অবস্থায় থাকা বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক তাদের চলতি হিসাবে ৩৩৬ কোটি টাকা ঘাটতিতে রয়েছে। গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ঘাটতি ৩২ কোটি টাকা।

Facebook Comments Box

Posted ১:৪১ অপরাহ্ণ | বুধবার, ২১ আগস্ট ২০২৪

sharebazar24 |

আর্কাইভ

রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি
 
১০
১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭৩০৩১
মো. সিরাজুল ইসলাম সম্পাদক
বার্তা ও সম্পাদকীয় কার্যালয়

৬০/১, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০

হেল্প লাইনঃ 01742-768172

E-mail: sharebazar024@gmail.com