বৃহস্পতিবার ১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১লা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ব্রেকিং নিউজ >>
ব্রেকিং নিউজ >>

ধারাবাহিক লোকসান সত্বেও অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধি : কারণ খতিয়ে দেখতে তৎপর বিএসইসি

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   মঙ্গলবার, ২৩ আগস্ট ২০২২ | 3641 বার পঠিত | প্রিন্ট

ধারাবাহিক লোকসান সত্বেও অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধি : কারণ খতিয়ে দেখতে তৎপর বিএসইসি

ধারাবাহিক লোকসান এবং ঝুঁকিপুর্ণ সত্বেও অস্বাভাবিক হারে দর বেড়েই চলেছে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত জুট স্পিনার্স লিমিটেডের। দীর্ঘদিন যাবত কোম্পানিটি উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। আবার কবে কোম্পানিটি উৎপাদনে ফিরবে কি-না তা নিশ্চিত করে বলা যায়। গত ৯ বছর ধরেই কোম্পানিটর বিনিয়োগকারীদের জন্য কোনো ডিভিডেন্ডও ঘোষণা করেনি। যে কারণে অর্ধযুগ ধরে করতে পারেনি বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম)। গত তিনটি প্রান্তিকেই কোম্পানিটি ধারাবাহিকভাবে লোকসান দেখিয়েছে। এত কিছুর পরও অস্বাভাবিক হারে কোম্পানিটির দর বেড়েই চলেছে। স্বল্পমূলধনী ও লোকসানী কোম্পানি হওয়ায় একটি চক্র নিজেদের ফায়দা হাসিলের জন্য পরিকল্পিতভাবে গুজব ছড়িয়ে অস্বাভাবিক দর বাড়িয়ে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে একটি চক্র। যা কারসাজি মনে হওয়ায় খতিয়ে দেখতে এবার মাঠে নামছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।

বাজার পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, বর্তমানে কোম্পানিটির দর গত দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। গত ৯ মাসেই কোম্পানিটির দর দ্বিগুণ হারে বেড়েছে। ২৮ নভেম্বর কোম্পানিটির দর ছিল ১০০ টাকা ৩০ পয়সা, যা গত ২১ আগস্ট দাঁড়ায় ২০৬ টাকা ১০ পয়সা। অর্থাৎ ৯ মাসে দর বেড়েছ ১০৬ টাকা। প্রকৃতপক্ষে ১৫ জুন থেকে শেয়ারটির দর অস্বাভাবিক হারে বাড়তে দেখা যায়। চলতি বছরের ১৫ জুন কোম্পানির শেয়ার লেনদেন হয়েছিল ১২৫ টাকা ৯০ পয়সায়। সেখান থেকে গত দুই মাসে ৮০ টাকা বেড়ে রোববার (২১ আগস্ট) লেনদেন হয়েছে ২০৬ টাকা ১০ পয়সায়। অর্থাৎ প্রতিটি শেয়ারের দর বড়েছে ৮০ টাকা ২০ পয়সা।

যেখানে ধারাবাহিক দরপতনে ভালো কোম্পানির দর তলানীতে অবস্থান করছে। সেখানে এই রকম একটি দুর্বল ও লোকসানী কোম্পানির দর বৃদ্ধিকে কোনো অবস্থায় স্বাভাবিক ভাবে দেখছেনা বাজার সংশ্লিষ্টরা। তারা মনে করছেন একটি চক্র যে এই শেয়ার নিয়ে খেলছে তা নিশ্চিত। এর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার দায় রয়েছে। বাজার মনিটরিং ঠিক মতো হচ্ছেনা বলেই এই রকম দুর্বল কোম্পানির দর অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে।

জানা যায়, কোম্পানিটির ১৭ লাখ শেয়ারের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে ৬০.১৮ শতাংশ। বাকি ৩৯.৮২ শতাংশ শেয়ার রয়েছে কোম্পানির উদ্যোক্তা-পরিচালকদের হাতে।

বিভিন্ন ফেসবুকে ‘শিগগিরই ঋণ পরিশোধ করে কোম্পানিটি উৎপাদনে ফিরবে’- বলে গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তাতে হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন বিনিয়োগকারীরা। শেয়ারটির দাম ৩০০ টাকা পর্যন্ত যাবে বলেও গুজব ছাড়নো হচ্ছে। যদিও কোম্পানি কর্তৃপক্ষের কাছে এই বিষয়ে কোনো তথ্য নেই।

ডিএসই থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের কোম্পানির পেইড আপ ক্যাপিটাল ১ কোটি ৭০ লাখ টাকার। প্রায় ২ কোটি টাকার কোম্পানির শেয়ারের মূল্য চলতি বছরের ১৫ জুন ছিল ২১ কোটি ৪০ লাখ ৩০ হাজার টাকা। কারণ সেদিন পর্যন্ত ১০ টাকার শেয়ারের মূল্য ছিল ১২৫ টাকা ৯০ পয়সা। সেখান থেকে গত ২ মাস ৫ দিনে ৮০ টাকা বেড়ে লেনদেন হয়েছে ২০৬ টাকা ১০ পয়সা দরে। তাতে কোম্পানির বাজার মূল্য দাঁড়িয়েছে ৩৫ কোটি ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকায়। অর্থাৎ দুই মাসে ১৭ লাখ শেয়ারহোল্ডারদের মুনাফা হয়েছে ১৩ কোটি ৬৩ লাখ ৪০ হাজার টাকা।

হঠাৎ অস্বাভাবিক হারে বন্ধ কোম্পানির শেয়ারের দর বাড়ার পেছনে কোনো মূল্য সংবেদনশীল তথ্য আছে কি না, জানতে ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ কোম্পানিকে চিঠি দিয়েছে। চিঠির জবাবে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ ডিএসইকে জানিয়েছে যে, তাদের কাছে কোনো মূল্য সংবেদনশীল তথ্য নেই।

আর মূল্য সংবেদনশীল তথ্য ছাড়াই শেয়ারটির দর বাড়ার পেছনে কোনো কারসাজি হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখবে শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।

এই বিষয়ে ডিএসইর চিফ রেগুলেটরি অফিসার (সিআরও) খায়রুল বাসার আবু তাহের মোহাম্মদ বলেন, খালি চোখে দেখা যাচ্ছে শেয়ারটিতে কিছু একটা হচ্ছে। তাই কোম্পানির কাছে দর বৃদ্ধির পেছনে কোনো তথ্য আছে কি না জানতে চাওয়া হয়েছে। কোম্পানি বলেছে তাদের কাছে কোনো সংবেদনশীল তথ্য জানা নেই। বিষয়টি আমরা কমিশনকে অভিহিত করব।

এই বিষয়ে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মোহাম্মদ রেজাউল করিম সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। শেয়ারটি নিয়ে কারসাজি হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উল্লেখ্য, মালিকানার দ্বন্দ্বে বছরের পর বছর ব্যবসায় লোকসানের পাশাপাশি অর্ধযুগ ধরে উৎপাদন বন্ধ, নগদ অর্থ সংকট ও পাওনাদারদের টাকা পরিশোধে ব্যর্থতাসহ ঋণের ভারে জর্জরিত জুট স্পিনার্স লিমিটেড এখন অস্তিত্ব সংকটে। বর্তমান অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে পৌনে দুই কোটি টাকার কোম্পানির ব্যাংক ঋণ ৪৯ কোটি টাকা! এর সঙ্গে গত এক দশকে কোম্পানির পুঞ্জীভূত লোকসান ২৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ কোম্পানির সম্পদের চেয়ে লোকসান অনেক বেশি।

ডিএসইর তথ্য মতে, জুট স্পিনার্স লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ শামস-উল হকের মৃত্যু হয় ২০১০ সালে। এরপর থেকে তার ছেলেরা কারখানাসহ সম্পদের মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্বে জাড়িয়ে পড়েন। শামস-উল হকের মৃত্যুর প্রথম দুই বছর অর্থাৎ ২০১২ সাল পর্যন্ত কোম্পানিটি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলে।

এরপর থেকে ব্যাংকের ঋণ বৃদ্ধির পাশাপাশি শ্রমিক জটিলতায় লোকসানে নিমজ্জিত হয় কোম্পানিটি। একপর্যায়ে চালাতে না পেরে ২০১৬ সালের জুন মাস থেকে উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হয়। যা এখনো বন্ধ রয়েছে।

এদিকে, এ কোম্পানির নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে নিট লোকসান হয়েছে সাত কোটি ৫৮ লাখ টাকা। চলতি অর্থবছরের (২০২১-২২) তিন প্রান্তিকে লোকসান আরও বেড়েছে। এ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসের অনিরীক্ষিত প্রতিবেদন অনুসারে, শেয়ারপ্রতি কোম্পানিটির লোকসান হয়েছে ১০ টাকা ৮৩ পয়সা। ফলে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদের মূল্য ঋণাত্মক হয়ে দাঁড়িয়েছে ৪৪৬ টাকা ৭ পয়সায়।

১৯৮৪ সালে তালিকাভুক্ত এক কোটি ৭০ লাখ টাকার পরিশোধিত কোম্পানিটির ৪৯ কোটি টাকার ব্যাংক ঋণ রয়েছে। তবে, ডিএসইর ওয়েবসাইটে দেখানো হয়েছে ৪০ কোটি ৬৮ লাখ ছয় হাজার টাকার ঋণ। এর মধ্যে ৩১ কোটি ৭৭ লাখ ছয় হাজার টাকা স্বল্পমেয়াদি এবং আট কোটি ৯১ লাখ টাকার দীর্ঘমেয়াদি ঋণ।
এই ঋণের সঙ্গে কোম্পানির পুঞ্জীভূত লোকসান ২৬ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ ঋণ ও লোকসান মিলে কোম্পানির কাছে পাওনা ৭৫ কোটি টাকা। এর বিপরীতে কোম্পানির সম্পদের মধ্যে রয়েছে ১০ দশমিক ২০ এককর জমি, কারখানা ও মেশিন।
শেয়ারবাজার২৪

Facebook Comments Box

Posted ৯:৪১ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ২৩ আগস্ট ২০২২

sharebazar24 |

এ বিভাগের আরও খবর

আর্কাইভ

রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি
 
১০
১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭৩০৩১
মো. সিরাজুল ইসলাম সম্পাদক
বার্তা ও সম্পাদকীয় কার্যালয়

৬০/১, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০

হেল্প লাইনঃ 01742-768172

E-mail: sharebazar024@gmail.com